হেমন্তযাপন এক চিরদিনের বিষণ্ণতা - তৈমুর খান
খুব মনে পড়ে তোমাকে। শীতের আগমন ঘটতে শুরু করেছে। চারিদিক ঘিরে আছে কুয়াশায়। রোদের তরোয়াল নিয়ে সূর্য উদয় হলে তুমি তার চকচকে বিভূতি জড়িয়ে আসবে আর বলবে: 'শিউলি ফুল এনেছি তোমার জন্য'। এক আঁজলা টাটকা শিউলির গন্ধ নিয়ে আমার দিন শুরু হবে। বিমোহিনী! আর আসবে না তুমি?
ধানকাটা মাঠ পড়ে আছে। অথবা সোনামুখী ধান শিশির মেখে রোদের অপেক্ষায় আছে। গৃহে গৃহে নবান্নের ডাক। আলতা ভেজা পায়ে এসে তুমি বসবে না দাওয়ায়? বলেছিলে নিমন্ত্রণ জানাবে এবার। খেজুর রসের সঙ্গে নতুন চালের পায়েস রান্না করে বলেছিলে খাওয়াবে। তারপর! অনেক অনেক তারপর! অপেক্ষা দীর্ঘতর হলো। তোমার হলুদ পাড় শাড়ি মহুয়া ফুলের গন্ধে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
আজও হেমন্ত আসে। নুয়ে পড়া কাশ আর ডানা ঝাপটানো হাঁস শূন্যে মিলিয়ে যায়। নৌকারা চলে যায় দূরে দূরে চোখের বাহিরে। মহাকাল পানে চেয়ে থাকি শুধু অন্ধ প্রেমিক এক।
মাঠময় ধান শুধু ধান। খড়ের শব্দ। পুকুর পাড়ে গরুগুলি বাঁধা আছে। গা চেটে দিচ্ছে কালি গাই। হলুদ প্রজাপতি এসে বসল হাতে। এক চিলতে রোদে বসেছি আমি ও জীবনানন্দ। নৈঃশব্দ্যের কোলে মাথা রেখে মাটি ও রোদের ঘ্রাণ পাই।
—এই বাতাসে শ্বাস নিয়ে ছিলে?সোনালি ধানের ক্ষেত ভালোবেসে কী গান তোমার মনে পড়েছিল কবি?
—সে অনেক গান! হেমন্ত বিয়ায়ে গেছে স্বরলিপি। কুয়াশায় মিশে গেছে তার ঘ্রাণ। ধানকাটা মাঠে নবান্নের ডাক পড়ে আছে। কিশোরীর খালি পায়ে ধানের ঝাড়ের ঘর্ষণ। আর বুকের আঁচল সরে যাওয়া আলো। প্রথম ভোরের মতো অরুণ কোমল লালচে অথবা গাঢ়।
—সব দেখেছিলে তুমি? আর ধানসিঁড়ি নদী! শালিক পাখি! কুয়াশা সরিয়ে যারা এসেছিল চুপি চুপি! টুপটাপ শিশিরের শব্দ! ভোরের দোয়েল পাখি!
—সেসব কত ছিল রাঙা ঠোঁট, বটফলের মতো করুণ চোখ, অথবা কামরাঙার হাসি। খইয়ের ধান ছড়ানো কিশোরীর হাত। কারও ঘুঙুর বেজেছিল। ধানের চালের গন্ধ, গোবর নিকানো উঠোন। কত একা একা বিকেলে ধানসিঁড়ি নদী ডেকেছিল।
—এই হেমন্তে আজও তুমি থেকে গেছো আমাদের কাছে। আমাদের শব্দে শব্দে, জীবনে জীবনে, উপলব্ধিতে, স্বপ্নে, দর্শনে। হেমন্ত আর ফুরোতে চায় না। কুয়াশা আর মৃদুমন্দ শীতে মহাজীবনের একটি প্রত্যয়নামা তোমার বিপুল বিস্ময়ে জেগে ওঠে। শব্দ খুঁজে পাই। জীবনবৃত্তান্ত লিখি এই জীবনে:
জীবন বৃত্তান্ত
📍
"পাশ ফিরে ঘুমোলাম হেমন্তকালের বিছানায়
কুয়াশায় জীবনবৃত্তান্ত মিশে গেল
শরীরে শীতের স্পর্শ
কারা এত সাপ পুষে রেখেছে আমার জন্য?
এত সাপ আমার ঘুমের ভিতরে ঢুকে যায়
আর ক্ষতবিক্ষত করে সারারাত
আমি তো সাপুড়ে নই
বাঁচার প্রলাপ শুধু জাগে
কখনো হাঁটুমুড়ে কখনো হামাগুড়ি দিয়ে বাঁচি
হেমন্তের রাত পার হয়
সকাল আসে না তবুও
জীবনবৃত্তান্ত মিশে যায় কুয়াশায়"
জৈব পদ্ধতির ক্রিয়াগুলিই সাপ। সাপেরা ছোবল মারে। সমস্ত জীবন ধরে বিষ ভোগ করি। কিন্তু কেউ জানে না। হেমন্ত জানে। তার কুয়াশায় জীবনবৃত্তান্ত মিশে আছে। কী সেই জীবনবৃত্তান্ত?
শৈশব থেকে যৌবন মাঠ মাটি আর ধান। ধানকাটা, ধান কুড়ানো, ধান মাড়াই, ধান সেদ্ধ, তারপর ধান শুকিয়ে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চাল বের করা। কত কত চাল বেরিয়ে গেছে। চালের ঘ্রাণে প্রাণ জুড়িয়েছে। কখনো মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান বের করে এনেছি। ইঁদুরের গর্ত খুঁড়তে গিয়ে মাটির ঘ্রাণে উজ্জীবন ফিরে এসেছে। সরষে গম আলু ক্ষেতের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখা হয়েছে যৌবনের প্রথম কিশোরীকে। ঘন কোঁকড়া চুল আর ছেঁড়া ফ্রকের আলো এসে পড়েছে চোখে-মুখে। তারপর শিশিরে আলতা ভেজা খালি পা। হেসেছে প্রথম হাসি। আমার শান্ত দিঘিতে কে ঢিল ছুঁড়ল আজ? প্রথম চিঠি লিখতে বসেছি তাকে:
"স্বপ্না, আজ হঠাৎ করেই তুই স্বপ্নে এলি! আমি আয়নায় আজ প্রথম মুখ দেখলাম আমার। না, এখনো গোঁফ গজায়নি। শুধু একটা গভীর কালো রেখা। আর এই কালো ভ্রমর দুটি চোখ গভীর বিস্ময় নিয়ে শুধু তোকেই দেখতে চায়! রাস্তার মাঝখানে কী যে একপলক দেখলাম! তারপর সেই দেখা আর ফুরোয় না। নিজের প্রেমে নিজেই পড়ে গেছি। যে-ই ঘাটে তুই নামিস, সেইখানে গিয়ে তোর পায়ের চিহ্ন খুঁজি। যে পাথরের উপর জল ভরা কলসি তুলে রাখিস, সেই পাথরকে আমি আদর করি। যে জলের দিকে তুই তাকাস, সেই জলকে আমিও দেখি। জল দেখতে দেখতে জলের ভেতর নিজেরই মুখ ভেসে ওঠে। আর নিজেকেই তখন দেখি। খুব সত্যি মনে হচ্ছে, তুই কি আমার ভেতর থেকে আমাকে এমন উত্তাল করে দিচ্ছিস? আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে তোকেই দেখছি। তুই না আমি? কে কার সংরাগ? শিউলি না মল্লিকার মতো তুই? আজ সারাদিন বাঁশবাগানের রাস্তায় একাকী দাঁড়িয়ে আছি। সূর্য ঢলে পড়ছে। শান্ত দিঘি। পাখিগুলো উড়ে যাচ্ছে একে একে। আমার কোনো বাঁশি নেই, তাই বাজাতে পারি না। কিন্তু মন তো বাঁশির মতো বাজে। শুনতে পাস মনের বাঁশির সুর? শুকনো ঝরা পাতা মাড়িয়ে যখন আসিস, যখন কলসির জল ছলাৎ ছলাৎ দোলে, যখন তোর সরু মাজা এপাশ ওপাশ করে, তখন দেখতে দেখতে আমি আর আমি থাকি না। আমি যেন কী হয়ে যাই! স্বপ্নে আসিস তবে আজ। মনে মনে চিঠি লিখিস। সে অনেক চিঠি। তোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যে বাতাস ফিরে আসে আমি টের পাই। ঘ্রাণ পাই। তাকেও আদর করি তোর নামে। সে অনেক আদর। আজ এই পর্যন্ত আবার বলবো কোনোদিন।
ইতি
তোর নদীর তীরের ঝরা কাশ।"
হেমন্তের ঝরা কাশ হয়ে পবনে উড়তে উড়তে, গগনে মেঘ হতে হতে, বাতাসে বাঁশি হতে হতে, স্বপনে সাহসী হতে হতে আমি লাজুক বিনম্র বয়ঃসন্ধি পার হয়ে আসি। জীবনানন্দ আমার পাশাপাশি হাঁটেন। আমার অন্তর্গত এক ব্যথাতুর হৃদয়ের কাতরানি অনুভূত হয়। কে কোথায় চলে গেছে দূরে, আমিই একাকী শুধু হেমন্তপুরে। নিঃস্ব যাপনের মতো দিনগুলি পার হয়। সজনে ফুল, কুমড়োলতার কাছে বসি। কাছাকাছি লাল ঠোঁট হলুদ পাখিরা আসে। আজ এতদিন পরও মনে পড়ে যায় বাঁশ বাগানের সরু রাস্তায় প্রথম দেখা মেঠো কিশোরীকে। সেও কি কোনো পাখি ছিল তখন? ময়না বুলবুলি কিংবা নতুন কোনো টিয়া?
ছাদের এক কোণে মেয়ের লাগানো টবে কামিনী ফুটেছে। তীব্র ঘ্রাণ আসছে কামিনীর। সাদা সাদা কামিনী কিছু বলতে চায় আজ? ওপাশে গন্ধরাজ। তবু আমি নীরব। ব্যাকুলতা আকাশের মতো দিগন্ত ছাপিয়ে সোনালি রোদের পাখনায় উড়ে গেছে। কবিতায় শুধু শব্দগুলি নেমে আসে। জমাট অশ্রুবিন্দুর মতো ভারী শব্দগুলি। আর বিমোহিত উপলব্ধির কুসুম কোনো স্বপ্নরাজ্যের বাগানে ফুটতে চায়। তখন সরে আসি কবিতার কাছে:
হেমন্তের পাখিগুলি
📍
"হেমন্তের পাখিগুলি উড়ে গেছে দিগন্তের দিকে
পাতা ঝরে যাওয়া গাছে উদাসীন বিরহ অসুখে
হাতের মুঠোয় রোদ
রোদের কুয়োর ধারে এসে
আজ ভাষা পেতে চায়
আমাদের সর্বহারা বোধ
কাকে যেন কাছে ডাকি রোজ
কাকে যেন স্বপ্নে দেখি রাতে
হেমন্তের পাখিগুলি
আমাদের হৃদয়ে ডাকে"
হেমন্তের পাখিগুলি আজ আর বাগানে ডাকে না। আজ সমস্ত বাগান এই হৃদয়ের মধ্যে। সেখানেই পাখিগুলি ডাকে। গান গায়। লাফায়। বাসা বাঁধে। কোথাও আর ধান কাটামাঠ নেই। এই হৃদয়ের মধ্যেই সমস্ত ধানকাটা মাঠ পড়ে আছে। এই হৃদয়ের মধ্যেই ঝরা ধান কুড়োতে থাকি। মাটি কেটে কেটে ইঁদুর গর্তের ধান তুলে আনি। এই হৃদয়ের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ সোনার তরী ভাসিয়ে দেন। আমিও ভাসতে চাই সোনার তরীতে। টুপটাপ শিশির ঝরার শব্দ পাই। ভোরের প্রথম ট্রাম ছুটে যায়। হৃদয়ের মধ্যেই এক হৃদয় জেগে ওঠে। ধানসিঁড়ি নদী জেগে ওঠে। মহুয়া ফুল ঝরে। জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয়, সে অনেক কথা।
বাহিরের পৃথিবী অন্তরের পৃথিবী হয়ে ওঠে। বাহিরের শব্দগুলি অন্তরের শব্দ হয়। এক ছড়ানো উষ্ণতায় আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে সেইসব শব্দের কাছে আত্মগোপন করি। তাই হেমন্ত কখনো ফুরিয়ে যায় না। শুধু ঋতুর হেমন্ত নয়, জীবনের হেমন্তকাল বহু বিস্তৃত। আর এক হেমন্তে উপনীত হয়ে সর্বদা তাকেই স্বাগত জানাতে থাকে। সর্বনাম ও ক্রিয়াগুলি উন্মুখ হয়ে ওঠে বন্দনায়:
ঋতুমতী
📍
"আবার হেমন্তকাল এল
গাছের পাতায় লেখা
তোমার চিঠিগুলো
উড়াল বাতাস
আমি নীরবতা ভঙ্গ করিনি
কথা এসে ফিরে গেছে
কুবাক্য চতুরবাক্য কেউকে ডাকিনি
শুধু জলের ছায়ায় নিজেকে দেখেছি
কবে আমি জল হব ? কবে ?
তোমাকে আমার কাছে ডাকব চুপিচুপি
ঋতুতে ঋতুতে তুমিও ঋতুমতী
ধুয়ে নিচ্ছ শরীর তোমার
চুল শুকোচ্ছ আকাশের ছাদে…"
সামনেই শীত আসছে। সংকেত দিয়েছে শীতের। তবে কি বাঁচাতে পারব আমার নন্দিত শিহরনগুলি? গাছের পাতায় পাতায় কার পাঠানো চিঠিগুলি ঝরছে। যে চিঠিগুলি তাকে একদিন লেখার আবেদন করেছিলাম। এখনো মগ্ন জলের কাছে নিজের ছায়া দেখি আর সেই প্রথম যৌবনের রূপটি জেগে ওঠে। নীরব ভাষায় কাছে ডাকতে থাকি। এই ডাকা কখনো শেষ হয় না। সব ঋতুতেই সে-তো ঋতুমতী। আকাশে-অনন্তে তার অবাধ বিচরণ। হয়তো চুল শুকিয়ে নিচ্ছে আকাশের ছাদে। এই হৃদয়ের স্বপ্ন কি রক্ষা করতে পারব সামনের শীতের কাছে? তবু হয়তো বলতে পারব জর্জ এলিয়টের কথায়:
"Is this not a true autumn day? Just the still melancholy that I love – that makes life and nature harmonize."(George Eliot)
অর্থাৎ এটি কি সত্যিকারের হেমন্তের দিন নয়? আমি এখনও যে বিষণ্নতাকে ভালোবাসি—যা জীবন এবং প্রকৃতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। বিষণ্ণতাই থাক আমার। আমি সব আয়োজনেই আমার সেই শূন্যতা, সেই না পাওয়া, সেই সরু মাজার হিল্লোল, ছলাৎ ছলাৎ কলসির জল আর কুয়াশা ঢাকা বাঁশবাগানের পথে আমার বিষণ্ণতাকেই খুঁজে যাব চিরদিন।
#storyandarticle
Post a Comment