মরমীবাদ ও বাংলা কবিতা - একটি আত্মোপলব্ধি মূলক বিশ্লেষণ - সৌম্য ঘোষ


story and article


মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা যা ‘সুফিতত্ত্ব’কে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছে। সুফিতত্ত্বের সারতত্ত্ব:

“হৃদয়ে তোমার চলে যেন আলিফের (আল্লাহ) খেলা। পবিত্র দৃষ্টি দিয়ে যদি তুমি জীবনকে দেখতে শেখো, তুমি জানবে আল্লাহর নামই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রেমময় ও সৌন্দর্যময়। তিনি অনন্ত, অবিনশ্বর ও সর্বত্র বিরাজমান। প্রেম ও ভক্তির পথে আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারাই তাঁকে পাওয়া যায়। আল্লাহতে অনুগত বা লীন হওয়া সুফি সাধকের চরম লক্ষ্য।”

ইন্দ্রিয়মুক্তি ও চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্ম-সমর্পণের সাধনাই সুফিদের আধ্যাত্মিক সাধনা। সুফিরা মানব-সেবার কাজেও নিজেদের জীবন কুরবান করেছেন, কেননা মানব-সেবাকে তাঁরা একটি পবিত্র ব্রত এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বলে বিশ্বাস করেন। সুফিশ্রেষ্ঠ জালালুদ্দিন রুমী বলেছেন :

‘মানুষের হৃদয় জয় করাই হলো সবচেয়ে বড় হজ।’

মধ্যযুগের মুসলিম কবিরা প্রধানত ফারসি ও হিন্দি ভাষায় রচিত সুফি সাহিত্যের গ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদ করেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’, দৌলত উজির বাহরাম খাঁর ‘লাইলী-মজনু’, কাজী দৌলতের ‘সতী ময়না-লোর চন্দ্রানী’, আলাওলের ‘পদ্মাবতী’, নাওয়াজিস খানের ‘গুলে-বকাওলী’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলা ভাষায় সুফিতত্ত্ব বিষয়ে বেশ কিছু মৌলিক শাস্ত্র-কাব্য এবং পদাবলী রচিত হয়েছে। এগুলোতে সৃষ্টিতত্ত্ব, যোগতত্ত্ব, ধর্ম ও নীতি বিষয়ক বর্ণনা আছে। এ ছাড়া দেহতত্ত্ব, জন্ম-মৃত্যুর রহস্য ইত্যাদির বর্ণনাও পাওয়া যায়। সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানপ্রদীপ ও জ্ঞান চৌতিশাকাব্যে দরবেশতত্ত্ব, এবাদত, আত্মতত্ত্ব, জিকির, ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি রয়েছে। সুফিতত্ত্বের কবিরা আবেগ, উপলব্ধি, আবেদন, নিবেদন ইত্যাদি সরাসরি কিংবা রূপক-প্রতীকের মাধ্যমে ব্যবহার করেছেন।

এ যাবৎ প্রায় শতাধিক মুসলিম পদকর্তার নাম জানা যায়। প্রথম শ্রেণীর পদকর্তা হিসাবে আইনুদ্দীন, আফজাল, আলাওল, আলী রজা, শেক কবির, শেখ চাঁদ, সৈয়দ মর্তূজা, সৈয়দ সুলতান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলার মুসলিমদের সুফিধর্ম সাধনা ও তত্ত্বচিন্তা এবং তার অন্তর্মুখী ভাবনার পরিচয় এদের কাব্যগাথায় নিহিত রয়েছে। এসব কাব্যগাথা সেকালে মুসলিমদের ঘরে ঘরে সুর করে পাঠ করা হতো।

আসলে সব ধর্মই একটি বিশিষ্ট ভঙ্গি লয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে মরমী বা মিষ্টিক কবিতার রূপ গ্রহণ করেছিল। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে কত যে বিচিত্র আধ্যাত্ম-সাধনার পন্থা দেখতে পাওয়া যায় তার অন্ত নেই।

বাউল তথা যোগী-দরবেশদের সাধনা মূলতঃ বিশুদ্ধ প্রেমভিত্তিক। বাউল দর্শনের প্রধান কথা—- ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করা, নিয়ন্ত্রিত করা, ঊর্ধ্ববাহু করা। এদের সব সাধনা, ধ্যান-ধারণা জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, বিশেষত দেহ ও নাড়িজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। এই সাধনা জীবনরহস্য উদঘাটনের সাধনা, সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মূলতত্ত্ব সম্যকভাবে জানা।

লালন শাহ বাউলদের সাঁই। লালন ফকির যে একজন অসাধারণ প্রতিভাশীল ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর খোঁজখবর তেমন কেউ রাখত না বলে রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলেছেন, আমাদের আশপাশের খবর আমরা রাখি না। লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে জানা যায়।

লালন শাহকে আমরা তাঁর অফুরন্ত সাধন-সঙ্গীতের ভাবরসে স্পষ্ট করে পাই। সুফি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলেও মূলতঃ তিনি ছিলেন বাউল তত্ত্ববাদী এক মরমী কবি। কাছে থেকেও যিনি দূর রচনা করেন, যাকে পেলে সব শোক-দুঃখ ও ভবযন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং যে সাঁই বস্তুরূপে শুরু করে অনন্তরূপে প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলেন, তাঁকে খোঁজাই ছিল লালনের জীবন-সাধনা। তাই দেহকে জরিপ করে অর্থাৎ বস্তুচেতনার ভেতর দিয়ে তাঁর অলক্ষ্য পড়শির সন্ধান শুরু—

“আমি একদিনও না দেখিলাম তারে,

আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর এক পড়শী বসত করে।”

সীমা-অসীমের তত্ত্ব লালন বিস্ময়কর সহজতায় ও সঙ্গীত-রসে প্রকাশ করে বলেছেন—-

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়

তারে ধরতে পারলে মন-বেড়ি দিতাম তাহার পায়।

আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা

মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা

আয়না মহল তায়।”

বাউল সাধনার গূঢ়-যোগক্রিয়া, মরমীবাদের সাংকেতিক শব্দচিত্র ও নানা তত্ত্বকথার অবতারণা করলেও লালনের সহজ কবি-মন সেই পরম-জনের সন্ধানে কেমন উচ্ছ্বসিত ও অধীর হয়ে উঠেছে, যখন শুনি ‘আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।’

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে লালনের আধ্যাত্মিকতার একটি সগোত্রতা আছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুরেরও। যেমন লালনের ‘যা করবি তুই এই দুনিয়ায়, সেই জিনিস তোর সঙ্গে যাবে’ গানটির সুর সাদৃশ্যে রবীন্দ্রনাথ তার ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি/নিয়ে যাবি কে আমারে’ গানটির সুররূপ দিয়েছিলেন। আসলে লালনের ভাব-সাধনার দ্বারা রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিলেন।

লালন শাহর সঙ্গীত আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ দেশে বাউল গানের অন্ত নেই। সহজ ও স্বচ্ছন্দ প্রকাশভঙ্গির ভেতর দিয়ে কত কালের ক্রম বিবর্তিত সাধনা ও লোকোত্তর চেতনায় সমৃদ্ধ বাউল হৃদয় উচ্ছ্বসিত ও আবেগদীপ্ত হয়ে উঠেছে। তাই লালন সঙ্গীত তথা বাউল গান আমাদের আধ্যাত্মিক এক বিশিষ্ট অংশ অধিকার করে আছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবিভক্ত বাংলার সিলেটে আরো দু’জন মরমী কবি হাসন রাজা ও রাধারমণের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হাসন রাজার গান আজও সিলেটের নরনারীর কণ্ঠে কণ্ঠে ঘোরে ফেরে।

হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সমভাবে আদৃত। অসংখ্য বাউল গান রচনা করেছেন তিনি। তাঁর গানে অপূর্ব কবিত্ব শক্তি রয়েছে। ভাষা অত্যন্ত সরল ও উদার। হাসন রাজার তত্ত্বমূলক আরেকটি গান—–

‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে/দেখিলাম রে আপনার রূপ, আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল মোরে।’

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যুগস্রষ্টা তিন কবি—-মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। বহুকাল পরে বাংলা সাহিত্যে যে গতি পরিবর্তন হয়েছিল তার প্রথম সূচনা মধুসূদনের প্রতিভায়। কবিচিত্তের সাথে মরমীবাদের যোগ স্থাপিত না হলে কবি পরিচয় যেন যথার্থ হতে পারে না।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ’ই তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কীর্তি। বীররসের কবিরূপেই তিনি সমধিক পরিচিত। কিন্তু এই কাব্যের অন্তরালে যেন এক নবজাত শিশুর ক্রন্দন-ধ্বনি, এক নতুন মানুষের নতুন পিপাসার আর্তি পাঠকহৃদয়কে উতলা করে তোলে। মধুসূদনের অন্য দু’টি গীতিকাব্য—‘ব্রজাঙ্গনা ও ‘বীরাঙ্গনা’। ‘ব্রজাঙ্গনা’র প্রতিপাদ্য রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়-লীলা যা অনায়াসে চিত্তে মরমী সুরসঞ্চার করে। এ কাব্যখানি বৈষ্ণব পদাবলীরই সমতুল্য।

‘চির স্থির কবে নীর, হায়রে জীবন-নদে!’ ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতার এই অসামান্য চরণ এক মরমী কবির সুপ্ত আত্মারই প্রতিধ্বনি, যা নিবারণ করা মধুসূদনের পক্ষে অসাধ্য ছিল। তাঁর ‘আত্ম-বিলাপ’ ও ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার ‘শ্যামা-পক্ষী’, ‘সৃষ্টিকর্তা’ এবং বঙ্গভাষা সনেটে মরমী চিত্তের যে আর্তনাদ ও হাহাকার, পাঠককে তা কান পেতে প্রাণে গ্রহণ করতে হয়।

মধুসূদন থেকে বাংলা সাহিত্যে যে যুগ প্রবর্তিত, রবীন্দ্রনাথে তা চরম পরিণতি লাভ করে। অকূল তটবিহীন এক ভাবসাগরে রবীন্দ্রনাথ তা পৌঁছে দেন। ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতার তিনটি মূলাশ্রয়—-ভক্তিমূলক, প্রকৃতি প্রেম ও মানবিকতা। ভক্তিমূলক তাঁর পূজা পর্যায়ের কবিতাগুলোর বাণীতে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের যে আকৃতি রয়েছে, তা হৃদয়ের সূক্ষ্মতম পর্দা পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। বেদ-বেদান্ত এবং উপনিষদের প্রভাব যদিও রবীন্দ্রকাব্যে স্পষ্টতর, কিন্তু সে প্রভাব শুধু কবিতার রূপকল্পে, ছন্দে এবং শব্দ ব্যবহারে। তিনি বৈদিক মন্ত্রকে মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, অলৌকিক জ্যোতির্ময়তা তখনই সম্ভব যখন চিত্তে আনন্দ রূপলাভ করে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার গানের মধ্যে সঞ্চিত হয়েছে দিনে দিনে আলোকের প্রকাশ-সৃষ্টির প্রথম রহস্য আর সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত।’ কবি বিশ্বাস করতেন, বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড এক মৌলিক সঙ্গতিতে সংরক্ষিত। বিভিন্ন কবিতায় তিনি এই সঙ্গতির সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছেন। এই উপলব্ধিতে মিষ্টিকভাব রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্য ও গানে প্রবাহিত। তিনি অন্তরের মধ্যে এই উপলব্ধিকে আজীবন জাগ্রত রেখেছেন।

রস, রসাবেগ ও রসবোধ চিত্তের বেদনায় উজ্জ্বল। এই মধুর রসে আর্দ্র ও সিক্ত হওয়াই সাধকের প্রেম। এ প্রেমের সাধনাই মিষ্টিকের ধর্ম। বাংলার বাউল বলেছেন,

‘নিত্য দ্বৈতে নিত্য ঐক্য, প্রেম তার নাম।’

সাধক কবি রবীন্দ্রনাথের বহু গানে সীমা-অসীমের এই মিলন-তত্ত্বের দ্বন্দ্বলীলা বিদ্যমান। চিত্তের গভীরে সাধক যখন আত্ম উৎসের সন্ধান লাভ করেন, তখন নিমেষে সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংশয়ের অবসান ঘটে। সত্য তখন সহজ হয়ে তার মুক্ত স্বচ্ছ দৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়। কবি রবীন্দ্রনাথের চোখেও এই ভাবালোক বা স্বপনপারের রূপ ধরা পড়েছে ‘খুঁজে যারে বেড়াই গানে, প্রাণের গভীর অতল-পানে, যে জন গেছে নাবি, সেই নিয়েছে চুরি করে স্বপ্ন লোকের চাবি।’

ব্যাকুলচিত্তে নির্জনে বসে পরমকে স্মরণ করাই তো সাধনা। সংসারের সব কোলাহল ও চিত্ত বিক্ষোভের মধ্যে প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছতায় বাস করেও গভীর নির্জনে, শান্ত ও সংযত অবসরে পরমের জন্য আকুল হওয়া।

সুফি সাধকেরা ‘মালিক’ শব্দের মরমী অর্থে প্রবেশ করে স্রষ্টার অন্তরতম ও অন্তরঙ্গ হতে আজীবন প্রয়াস পেয়েছেন। ‘আমার আমি’ সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণভাবে তাঁর। এই চিরন্তন মধুরতম যোগসম্পর্ক আন্তরিক সাধন-সৌন্দর্যে সাধক-হৃদয়ে ফিরে আসে বারবার।

রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় মৌলিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মৌলিক কাব্য-প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন বলেই মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনি যুগ ‘প্রবর্তক কবি’ হিসেবে স্বীকৃত। ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে সমধিক খ্যাত নজরুলের মরমী কবিতা, অসংখ্য গজল ও গান আজও পাঠক-শ্রোতাকে সমান ভাবে আপ্লুত করে রাখে। ধর্মীয় বা শাস্ত্রীয় নির্দেশ ও ব্যাখ্যার বাইরে যে আত্ম-নিমগ্ন উপলব্ধি— যাকে ‘আধ্যাত্মিকতা’ বলা যেতে পারে, বারে বারে তার প্রকাশ ঘটেছে নজরুল-সাহিত্যে এবং তা বাংলা সাহিত্যের এক অপূর্ব সম্পদ। তাঁর ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যের কোনো কোনো কবিতায় আধ্যাত্মিক উপলব্ধির গভীরতা ও অনন্য প্রকাশ নজরে পড়ে।

নজরুলকে মূলত: প্রভাবিত করেছে সুফিতত্ত্ব। ফারসি কাব্যের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ও মরমীবাদকে তাঁর মনের গভীরে শুধু যে স্থান করে দিয়েছে তা নয়, তাঁর কবি-সত্তার দৃষ্টিভঙ্গিও যেন আমূল বদলে দিয়েছে। গোটা ফারসি সাহিত্যেরই মূল সুর Mysticism । আর বাংলা সাহিত্যে নজরুল-মানস তারই এক জ্বলন্ত প্রতীক।

আত্ম-সংস্কারমুক্ত এ আত্মাই স্রষ্টা ও সৃষ্টের ভেদাভেদ অস্বীকার করে তাতে একাকার হয়ে ডুবে যাওয়ার উপলব্ধি করতে সক্ষম। এ সাধনা সব দেশের সব ধর্মের ভক্তরাই করেছেন। খ্রিষ্টীয় মিষ্টিকরাও এ পথেরই সাধক।

নজরুল ইসলাম কবি হিসেবে যেমন হৃদয়ধর্মী, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ক্ষেত্রেও তিনি তেমনি হৃদয়ধর্মী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়াও ওই সময়কার বাংলা আধুনিক সঙ্গীত জগতে ‘পঞ্চভাস্কর’ হিসেবে সুপরিচিত অন্য তিন গীতিকবি অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলালের গানেও Mysticism -এর প্রভাব যথেষ্ট পরিলক্ষিত।

রবীন্দ্রযুগে বাস করেও পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বাংলা কাব্য সাহিত্যে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। পল্লীর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনাই তাঁর কবিতার উপজীব্য। তিনি প্রচুর ভাটিয়ালী গানের স্রষ্টা। তাঁর কবিতা ও গানে হৃদয়ের যে আর্তি ও মর্মবেদনা, তা পাঠক-শ্রোতাকে অশ্রুসিক্ত করে তোলে। তাঁর ‘মুসাফির’ কবিতাটি পৃথিবীর পথে পথে কান্ত, দুঃখ ভারাক্রান্ত এক চির-বিরহীর প্রতীক, অতৃপ্ত হৃদয়ের হাহাকার যা কোনো দিনই দূর হয় না।

জসীমউদ্দীনের পল্লী গানেও রয়েছে মিষ্টিক সুরের আকুল আবেদন। তাঁর কবিতা ও গানে বাঙালির প্রাণের যোগই আমরা খুঁজে পাই।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আর এক ‘মিষ্টিক’ কবি জীবনানন্দ দাশ। জীবনের স্বরূপ উন্মোচনে তাঁর কবিতার অন্তর্গত এক দুরূহ কুহেলির সঙ্গে চির নিঃসঙ্গতা পাঠক হৃদয়কে মথিত করে তোলে। ভাষার কুজ্ঝটিকায় তিনি এমনসব গূঢ় কথা নানা ভাঁজে ভাঁজে বলেছেন যাতে সাড়া জাগায় তৃষ্ণা ও উন্মুখিতা নিঃশব্দে।

অসীমের প্রতি অনুরক্ত থেকে আত্ম তত্ত্ব-জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজে চলেছে কাল থেকে কালান্তরে। নানা মত ও নানা পথ ধরে আজও সংসারত্যাগী একশ্রেণীর মানুষ Mysticism বা মরমীবাদের ক্ষীণ ধারাকে প্রবাহিত রেখেছেন। এদের কেউ বাউল, কেউ বয়াতি, কেউ বা বৈষ্ণব-ফকির বলে আখ্যায়িত। আজও এ দেশের হাটে-মাঠে-ঘাটে এক তারা/দোতরা হাতে এদের অবাধ বিচরণ লক্ষণীয়। আজও লোকায়ত জীবনে চারণ-কবিদের পদচারণা উঁকি দিয়ে যায়। বাংলা ভাষায় মরমী সাহিত্যের উপাদান খুঁজতে হলে, দৃষ্টি দিতে হবে বাঙালির নাড়ির এইসব লোক-গাথা, বাউল, কীর্তন, জারি-সারির দিকে। কেননা এগুলোর মধ্যে গ্রোথিত থাকতে পারে আধ্যাত্মিক কোন গূঢ়তত্ত্ব, যা Mysticism বা মরমীবাদের মূল কথা।।

=========================

লেখক ••• সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া। পশ্চিমবঙ্গ।

storyandarticle.com