মহাশূন্যে জুরান - সিদ্ধার্থ সিংহ
চোখ খুলতেই জুরান দেখল ঘুটঘুটে অন্ধকার। কখন লোডশেডিং হয়েছে ও জানে না। সারা শরীর ঘামে জ্যাবজ্যাব করছে। বিছানা পর্যন্ত ভিজে গেছে।
কিছু দিন আগে ওদের বাড়িতে যে ইনভার্টারটা ওর বাবা নিয়ে এসেছেন, পাওয়ার কাট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক্যালি সেটা চালু হয়ে যাওয়ার কথা। এ ক’দিন তা হয়েওছে। কিন্তু আজ যে সেটা কেন হল না, ও বুঝতে পারল না।
ক’টা বাজে এখন! মাথার কাছে বালিশের পাশেই ছিল মায়ের মোবাইল। রোজই রাত্রিবেলায় খাওয়াদাওয়ার পরে এ ঘরে আসার আগে মায়ের মোবাইলটা ও নিয়ে আসে। প্রথম প্রথম যখন ওর মা জিজ্ঞেস করতেন, কেন নিচ্ছিস? ও কোনও দিন বলত, স্পেলিং চেক করার জন্য। আবার কোনও দিন বলত, সামনেই পরীক্ষা তো, শুধু রাত্রিবেলায় পড়লেই হবে না। খুব ভোরে উঠতে হবে। তাই তোমার মোবাইলটা নিচ্ছি। অ্যালার্ম দিয়ে রাখব। মুখে এ কথা বললেও ঘরে এসেই ক্লাস ফোরের পড়া যত না পড়ত, তার চেয়ে মোবাইলে গেম খেলত বেশি।
মায়ের সেই মোবাইলটা তুলে নিয়ে দেখল, রাত একটা পঁয়তাল্লিশ। একবার কারেন্ট গেলে যে কখন আসবে তার কোনও ঠিক নেই। দরদর করে ঘামছে। আর শুয়ে থাকা যাচ্ছে না। ও উঠে বসল। গা-টা একটু মুছতে পারলে হত। কিন্তু গামছাটা তো বাথরুমে। ঘরে ওর মা, বাবা আর ও, মোট তিন জন থাকলেও ডায়নিং স্পেসের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে ডিম্বাকৃতি ঢাউস একটা খাবার টেবিল। সে রকম লোকজন তাদের বাড়িতে না এলেও ওই টেবিল ঘিরে কেন যে ছ’-ছ’খানা চেয়ার, ও কিছুতেই মেলাতে পারে না।
এই অন্ধকারের মধ্যে গামছা আনতে গেলে খুব সাবধানে হাতড়ে হাতড়ে পা টিপে টিপে ওখানে যেতে হবে। না-হলেই পায়ে চেয়ার বেঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে কিংবা ধাক্কা খেতে পারে ফ্রিজের সঙ্গে। একটু অসাবধান হলেই কনুইতে লেগে টিভিটাও পড়ে যেতে পারে। একটু গা মোছার জন্য অত কষ্ট করে পা মেপে মেপে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। শুয়ে থাকার সময় গরম লাগছিল ঠিকই, কিন্তু খাটে উঠে বসার পর থেকে যেন গরমটা আরও বেশি লাগছে। না। গরম নয়। গরমের চেয়ে বোধহয় আর্দ্রতাটাই বেশি। তাই এই ভাবে ঘামছে সে। বড় অস্বস্তি লাগছে। মা দেখলেই খিচখিচ করে উঠবে। কিন্তু মা তো ওই ঘরে শোয়। এখনও নিশ্চয়ই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ফলে এখন আর দেখার কেউ নেই। তাই বালিশের ঢাকনাটা চট করে তুলে নিয়ে ভাল করে বুক, পিঠ, হাত, মুখ মুছে নিল সে।
অন্যান্য জায়গার তুলনায় ওদের বাড়িতে কারেন্ট খুব কমই যায়। সে যাক। কিন্তু কারেন্ট যাওয়ার আর দিন পেল না! আজ সকাল থেকে যা গরম পড়েছে, তার উপর এতটুকু হাওয়া নেই। কোনও রকমে চোখ দুটো একটু বুজে এসেছিল। আর তার মধ্যেই এই অবস্থা!
এই ঘরে আগেকার দিনের মতো খড়খড়ি দেওয়া বড় বড় দুটো জানালা। আট বন্ধু মিলে কো-অপারেটিভ পদ্ধতিতে এই ফোর প্লাস বাড়িটার প্রতিটি তলায় একই আয়তনের দুটো করে, মোট আটটি ফ্ল্যাট বানালেও, যে যার ফ্ল্যাট নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। কেউ মেঝেতে মার্বেল বসিয়েছে তো, কেউ দুটি শোবার ঘরের একটাকে বড় করে অন্যটাকে একটু ছোট করে আলাদা একটা ঠাকুরঘর বানিয়েছে। ডোরবেলের জায়গায় সাবেকি আমলের মতো কেউ দড়ি টানা পেতলের বিরাট একটা ঘণ্টা লাগিয়েছে, তো কেউ একই ঘরের এক-একটা দেয়াল, উপরের সিলিং, এ দিক ও দিককার বিট এক-এক রং দিয়ে রাঙিয়েছে।
জুরানের বাবা তিতার মনে-প্রাণে, কাজে-কর্মে এবং চিন্তা ভাবনায় চূড়ান্ত আধুনিক হলে কী হবে, তাঁর ছোটবেলাটা কিন্তু কেটেছে গত ছ’পুরুষের মতোই, পূর্বপুরুষের তৈরি করে যাওয়া, ভেঙে ভেঙে পড়তে থাকা কড়িবরগার প্রকাণ্ড একটা পাঁচ মহলা বাড়িতে। যে বাড়ি শরিকি বিবাদে কোনও দিনই সে ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। এ কার্নিশ সে কার্নিশ থেকে বট-অশ্বত্থের চারা একটু একটু করে ক্রমশ মাথা তুলছে। কিন্তু কেউই ভ্রুক্ষেপ করেননি। চুন-সুরকি খসে খসে দাঁত-মুখ বেরোলেও এক দলা সিমেন্টের প্রলেপও দেননি কেউ। বনেদিয়ানার চিহ্নস্বরূপ প্রধান ফটকের সামনে যে বিশাল তোরণটা ছিল, এক সময় আশপাশের লোকেরা যাতায়াতের পথে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখতেন। পরিচর্যার অভাবে সেটাও এখন শুধুমাত্র একটা লোহার কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। কেউ ভুল করেও ফিরে তাকায় না।
তিতার জানেন যত টাকাই থাকুক না কেন, আজকের দিনে ও রকম একটা বাড়ি বানানো আর কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। টাকা থাকলেও কেউ বানাবেন না। এটা জেনেও, সেই বাড়ির গন্ধটা এই বাড়িতে বজায় রাখার জন্য, তাঁদের সেই বাড়িটা যখন এক প্রোমোটার বিপুল টাকা দিয়ে কিনে নিলেন, তখন তিনি প্রোমোটারের কাছ থেকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওই বাড়িটার একটা ইট আর এই জানালা দুটো চেয়ে নিয়েছিলেন।
কো-অপারেটিভের লটারিতে যখন তাঁর ভাগে চার তলার এই দিকটা পড়েছিল, তখন এই শোবার ঘরের কাজ শুরু হয়েছিল ওই ইটটা দিয়ে। আর এ ঘরেই লাগানো হয়েছিল সেগুন কাঠের তৈরি প্রায় দরজা-সমান খড়খড়িওয়ালা এই জানালা দুটো।
বাবার কাছে জুরান শুনেছে, এই জানালা দুটো এত ভারী ছিল যে, দূর থেকে ওই জানালা দেখে রাজমিস্ত্রিরা তাঁর মুখের উপরেই বলে দিয়েছিলেন, এ রকম পলকা দেওয়ালে অত ভারী জানালা কিছুতেই বসানো যাবে না। তখন তাঁদের অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে, তাঁদের দিয়েই, ওই জানালা দুটোকে ধরে রাখার জন্য বিশেষ ভাবে পাকাপোক্ত করে গাঁথিয়ে নিয়েছিলেন এই দেয়াল।
ওর বাবা এখনও বলেন, এই জানালা দিয়ে যখন ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে, তখন নাকি সেই হাওয়ার মধ্যে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ির গন্ধ খুঁজে পান। সেই গন্ধই তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছোটবেলায়। তিনি খুঁজে পান তাঁর ছেলেবেলাকার সঙ্গী-সাথীদের। পাঁচ মহলা বাড়ির কানাঘুঁজি অলিন্দে তিনি তখন ছোটাছুটি করেন। চোর চোর খেলেন। দল বেঁধে হইহই করে পুকুরে যান। পুকুরের পার থেকে হেলে ওঠা খেজুর গাছে উঠে ঝপাং ঝপাং করে জলে ঝাঁপান।
একবার জলে ঝাঁপ দিতেই কে নাকি তাঁর একটা পা ধরে টানতে টানতে জলের অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। অথচ এমন তো হওয়ার কথা নয়। এই পুকুরে বাইরের কেউ নামে না। তা হলে কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাঁকে! কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারই মধ্যে উনি টের পেলেন, তাঁর পাশ দিয়ে কী যেন সাঁ করে এসে তোলপাড় করতে লাগল জল। সাঁতার জানলেও এতক্ষণ জলের তলায় থাকার অভ্যেস ছিল না তাঁর। তাই দম নিতে গিয়ে কয়েক ঢোক জলও খেয়ে নিয়েছিলেন তিনি। যখন আর পারছেন না, মনে হচ্ছে আর কোনও দিনই পারে উঠতে পারবেন না। শরীর ছেড়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই তাঁর পা ধরে যে এতক্ষণ টানছিল, সে ছেড়ে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে কে যেন তাঁকে কোলপাঁজা করে তুলে দিয়ে গেল জলের উপরে। বুক ভরে বড় বড় কয়েকটা শ্বাস নিয়ে যখন তিনি আশপাশে তাকালেন, দেখলেন কেউ কোত্থাও নেই।
এটা শুনে তিতারের বাবা থম মেরে গিয়েছিলেন। হাউ হাউ করে কেঁদেছিলেন তাঁর মা। বলেছিলেন, শরিকি শত্রুতা আজ এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, বাচ্চাদের প্রাণ পর্যন্ত নিতে চাইছে! আমি আর এখানে থাকব না। এক মুহূর্ত না।
বাবা বলেছিলেন, ঠিক আছে, কেউ না-হয় মারতে চেয়েছিল। কিন্তু ওকে বাঁচাল কে!
স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে জুরানের বাবা এখনও সেই গল্প করেন। আর একবার তাঁর ছোটবেলা নিয়ে গল্প শুরু করলে, তিনি আর কিছুতেই থামতে পারেন না। এই জানালা, জানালার সূত্র ধরে সেই পাঁচ মহলা বাড়ি, বাড়ি থেকে গ্রাম, গ্রামের মানুষ জন, ওখানকার বটবাবার পুজো... বাবাদের সেই বটবাবা নাকি এতটাই জাগ্রত ছিল যে, ওই বটগাছের কোনও ডালে লাল সুতো দিয়ে ছোট্ট একটা ইটের ঢেলা বেঁধে মানত করলেই, মাসও নাকি গড়াত না, হাতে-নাতে ফল পাওয়া যেত।
বাবাই বলেন, সেই পুজো নাকি টানা এক সপ্তাহ ধরে চলত। পুজো ঘিরে বসত বিশাল মেলা। মেলায় কত রকমের দোকান বসত। নাগরদোলা থেকে ইলেকট্রিক কন্যা, কিছুই বাদ যেত না। শুধু তাঁদের গ্রামই নয়, আশপাশের সব ক’টা গ্রামও ভেঙে পড়ত। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনেরা আগে থেকে এসে হাজির হত এর-ওর বাড়িতে। ও রকম উৎসব নাকি এখন আর কোথাও হয় না।
কেন হয় না? জুরান একবার জিজ্ঞেস করেছিল ওর বাবাকে। ওর বাবা বলেছিলেন, কী করে হবে? যে বটগাছটাকে ঘিরে ওই উৎসব হত, সেই গাছটাই যে একদিন প্রচণ্ড ঝড়ে উপড়ে গেল। গ্রামের লোকেরা ওটাকে বাঁচানোর জন্য কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টাই বিফলে গেছে। ফলে যাকে ঘিরে ওই উৎসব হত, সে-ই যখন নেই, কাকে ঘিরে মেতে উঠবে লোক?
তবু গ্রামের কয়েক জন মিলে গাছের ওই জায়গাটাকে গোল করে ঘিরে, ইট-টিট দিয়ে বাঁধিয়ে একটা বেদির মতো করে দিয়েছিলেন। কয়েক বছর ওই বেদিটাকে ঘিরে উৎসবটাকে চালু রাখার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু লোকজনের তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। আস্তে আস্তে মেলাটাই উঠে গেল।
জুরান বলতে চেয়েছিল, যে-গাছ নিজেকেই বাঁচাতে পারে না। সামান্য একটু ঝড়েই উপড়ে যায়, সে গাছে লাল সুতো দিয়ে ইট বাঁধলেই লোকজনের মনস্কামনা পূর্ণ হত, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমার তো মনে হয় সবটাই কাকতালীয়।
কিন্তু এ সব কিছুই বলতে পারেনি সে। ওর বাবা যখন যা বলেন, জুরান মন দিয়ে সব শোনে। কিছু বলে না। বলতে পারে না— তোমাদের সময় ওটাই ছিল একমাত্র রিক্রিয়েশন। ওটার জন্য তোমরা সারা বছর ধরে মুখিয়ে থাকতে। আর ওটা শুরু হলেই, সবটুকু চেটেপুটে নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগতে। অন্য কোথায় কত বড় মেলা হচ্ছে তা দেখার ফুরসতও পেতে না তোমরা। তোমাদের মনে হত, ওটাই বুঝি সব চেয়ে বড় মেলা। আর এই ধারণাটা তোমাদের মনের মধ্যে এমন ভাবে গেঁথে গেছে যে... তার উপরে ছোটবেলার স্মৃতি বলে কথা! তাই তোমার মনে হয়, অত বড় উৎসব আর কোথাও হয় না। এখন যদি তার থেকেও হাজার হাজার গুণ বড় কোনও উত্সবও হয়, দেখবে, তোমার ঠিক মনে হবে, না, এটা নয়, ওটাই অনেক বড় ছিল।
আসলে সময় পাল্টে গেছে। এখন যত বড় উৎসবই হোক না কেন, লোকেদের মধ্যে কিন্তু অত উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায় না। কারণ, লোকের হাতে এখন আর অত সময় নেই। সমস্ত কাজকর্ম সেরে, সময় পেলে কেউ আর কোনও উৎসব-টুৎসবের ধার ধারে না। যে যার মতো করে বিনোদন খুঁজে নেয়। কেউ টিভি দেখে। কেউ ফেসবুক খুলে বসে। কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে কথা বলে যায়।
ঘরেই এখন বিনোদনের এত ব্যবস্থা হয়ে গেছে যে, কেউ আর কোনও মেলা কিংবা কোনও উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে না। দেখো না, এখন আর ক’জন চৈত্র মাসের গাজনের মেলা নিয়ে মাতামাতি করে? ক’টা লোক কাঁটার উপর ঝাঁপ দেয়? ক’টা লোক মাছ ধরার বঁড়শি বুকে ফুঁড়ে চড়কিতে বনবন করে ঘোরে? রথের মেলাও কি আর আগের মতো অত জমজমাট করে হয়? দোল খেলার রমরমাও কি অনেক ফিকে হয়ে যায়নি?
না। বাবাকে সে এ সব কথা বলতে পারে না। বললে, বাবা হয়তো দুঃখ পাবেন। বাবা দুঃখ পাবেন, এমন কোনও কথাই সে বাবার সামনে উচ্চারণ করতে পারবে না। বাবার ছেলেবেলার স্মৃতি নিয়ে বাবা থাকুন। থাকুন তাঁর জানালা নিয়ে। জানালা দিয়ে আসা ছেলেবেলার গন্ধ মাখা ফুরফুরে সে-ই হাওয়া নিয়ে।
জুরান যখন এই সব ভাবছে, তার পিঠ দিয়ে তখন দরদর করে ঘাম নামছে। ও বালিশের ঢাকনাটা নিয়ে আবার বুক, পিঠ, হাত, মুখ মুছে নিল। উফ্, আর পারা যাচ্ছে না। কারেন্টই গেছে তো, নাকি ফিউজ উড়ে গেছে! জানালা দিয়ে একবার দেখি তো, আশপাশের বাড়িতে লাইট জ্বলছে কি না।
জুরান খাট থেকে নেমে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জানালার বিশাল বিশাল কপাট দুটো হাট করে খোলা। কিন্তু সেখান দিয়ে এক ফোঁটাও বাতাস ঢুকছে না। বাতাস যে বইছে না, তা নয়। জানালার কাছে এসেই বাতাস যেন থমকে দাঁড়িয়ে অভিমান করে অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। কিন্তু না। এ রকম তো হওয়ার কথা না।
এই ক’বছরে তাদের বাড়ির আশপাশে, গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বড় বড় বাড়ি মাথা তুললেও, তাদের এই জানালাটা কী করে যেন বারবারই ছাড় পেয়ে গেছে। আসলে এ জানালার মুখোমুখি যে ক’টা বাড়ি আগে ছিল এবং পরে হয়েছে, সেগুলি সব ক’টাই হয় দু’তলা নয়তো তিন তলা। সে জন্য এই জানালার সামনেটা একেবারেই ফাঁকা। ফলে আশপাশের বাড়ির তো বটেই, এই বাড়িরই অন্য ফ্ল্যাটের লোকদের দিনের বেলাতেও অনেক সময় লাইট জ্বালাতে হয়। কিন্তু ওদের তা কখনওই করতে হয় না। অন্তত এই ঘরে তো নয়ই।
কিন্তু এখন তো গভীর রাত। চার দিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। অথচ লাইট যে জ্বালাবে তারও উপায় নেই। লোডশেডিং। তাই জানালা দিয়ে যতটা দেখা যায়, ও দেখার চেষ্টা করল। দেখল, একটা-দুটো বাড়িতে শুধু আলো জ্বলছে। দেখে মনে হচ্ছে ওগুলো ইনভার্টার বা জেনারেটারে জ্বলছে। তার মানে, শুধু তাদের বাড়িটাই নয়, গোটা এলাকাটাই অন্ধকারে ডুবে আছে। অর্থাত্ লোডশেডিং-ফেডিং নয়, নিশ্চয়ই ম্যাসিভ কোনও ম্যাসাকার হয়েছে।
জুরান এ দিক ও দিক তাকাতে লাগল। হঠাৎ চোখ আটকে গেল সামনের তিন তলা বাড়িটার ছাদে। সে চার তলার ঘরে। ফলে তিন তলার ছাদটা খুব ভাল করেই দেখতে পাচ্ছে সে। তিন তলার ছাদে বিশাল বড় একটা সিমেন্টে বাঁধানো কেটলি। কেটলির মুখের কাছে বড় একটা প্লেটের উপরে মানানসই মাপের কারুকাজ-করা একটা কাপ। না। কেটলি না। ওটা আসলে একটা জলের ট্যাঙ্ক। আর কাপ-প্লেটটা এমনিই বানানো। ওই বাড়ির ভদ্রলোক বড় শখ করে ওটা বানিয়েছেন। ও সেটা জানে। কিন্তু তার পিছনে ওটা কী? একটা গোলাকার আলোক পিণ্ড না! হ্যাঁ, তাই তো! ওটা আবার লাইটের কোনও কারসাজি নয় তো! লোকটার যা মতিগতি, সব পারে। কিন্তু ওটা তো ঠিক লাইটের আলো নয়। ভারী অদ্ভুত এক মায়াবী আলো। মাঝে মাঝেই কেটলিটার পাশ দিয়ে একটু উঁকি মেরেই আবার লুকিয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, তার সঙ্গে যেন লুকোচুরি খেলছে। কী ওটা? কী?
(দুই)
কিছু দিন আগে জুরানের জন্মদিনে তার বাবা তাকে দুটো বই উপহার দিয়েছিলেন। উনি সাধারণত প্রতিবার ওকে বই-ই দেন। আগে রাক্ষস-খোক্কস, রূপকথা, হাসি, মহাপুরুষদের জীবনী এনে দিতেন। জুরান যত বড় হয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টেছে বইয়ের ধরনও। না, এ বার আর বাংলা নয়, ইংরেজিতে সড়গড় হওয়ার জন্য ওর বাবা ওকে এনে দিয়েছেন ফ্রঙ্কস্কলির লেখা ‘বিহাইন্ড ফ্লাইং সসারস’ এবং রেমন্ড লেসলি আর জন অ্যাডাম স্কি-র যুগ্ম ভাবে লেখা ‘ফ্লাইং সসারস হ্যাভ ল্যান্ডেড’।
বই দুটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ও পড়েছে। আর সেটা থেকেই ও জেনেছে, এক সময় উড়ন্ত চাকি নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে খুব হইচই হয়েছিল। লোকেদের ধারণা হয়েছিল, অন্য কোনও গ্রহ থেকে অতি বুদ্ধিমান কোনও প্রাণী উড়ন্ত চাকি করে ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝেই পৃথিবীতে চলে আসে। কেউ কেউ অবশ্য বলেছিলেন, না না, ঘুরতে ঘুরতে নয়। এই গ্রহ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আসে ওরা। কেউ কেউ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, না, শুধু খোঁজখবর নিতে নয়, ওই ভিন্ গ্রহবাসীরা আসলে এই পৃথিবীর মাটিতে তাদের উপনিবেশ গড়তে চায়।
আজ থেকে অনেক বছর আগে, ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে ‘ফ্লাইং সসারস হ্যাভ ল্যান্ডেড’ বইটির অন্যতম লেখক জন অ্যাডাম স্কি-ই নাকি প্রথম উড়ন্ত চাকি দেখেছিলেন। ওটা তখন মাউন্ট প্যালোমারের অবজারভেটরির ওপর চক্কর মারছিল। সঙ্গে সঙ্গে উনি ছুটে যান উড়ন্ত চাকি সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য আগে থেকে ওত পেতে রাখা পৃথিবীর সব চেয়ে শক্তিশালী দূরবিনের কাছে। তার মধ্যে চোখ রাখতেই তিনি দেখতে পান সেই ফ্লাইং সসারকে।
১৯৪৭ সালে কেনেথ আরনল্ড নামের এক আমেরিকাবাসীও এই ধরনের একটি উড়ন্ত চাকিকে দেখেছিলেন। ভদ্রলোকের মোটর গাড়ির মস্ত বড় ব্যবসা। নিজস্ব বিমানও আছে। একদিন সেই বিমানে করেই কোম্পানির একটি জরুরি মিটিংয়ে অন্য একটি শহরে যাচ্ছিলেন তিনি।
আকাশ তখন পরিষ্কার। দূরে মাউন্ট বেনিয়ারের চূড়ায় তুষারের স্তূপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হঠাত্ ককপিট থেকে আকাশের দিকে চোখ যেতেই তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কোনও অলৌকিকতা বা ভূত-প্রেতে তিনি বিশ্বাস করতেন না। ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ। ভাবুকতার কোনও স্থান ছিল না তাঁর জগতে। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে অত্যন্ত দামি। একদম সময় নষ্ট করেন না তিনি। তবু ও রকম একটা জিনিস দেখে চমকে উঠলেন। এত দিন ধরে তিনি আকাশে উড়ছেন, কই, এ রকম কোনও জিনিস তো এর আগে তিনি কখনও দেখেননি। মনে হচ্ছে, চায়ের কাপের প্লেটের মতো বিশাল বিশাল কয়েকখানা ডিশকে উপুড় করে কেউ বুঝি আকাশে ভাসিয়ে রেখেছে। সেগুলি বনবন করে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে যাচ্ছে। মাত্র অল্প কিছুক্ষণ। তার পরেই সেগুলি হুস করে আরও উঁচুতে উঠে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
পর দিন সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তিনি যখন সেই উড়ন্ত চাকির কথা বললেন, তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করলেন, কেউ করলেন না। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল তুমুল চাপানউতোর। অনেক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী বললেন, এমনটা হতেই পারে। কিন্তু সেই বস্তুটা যে আদতে কী, সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তাই তাঁরা তার নাম দিলেন, আন আইডেনটিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট। সংক্ষেপে ইউ এফ ও কিংবা ফ্লাইং সসার। এ দেশীয়রা যার বাংলা নামকরণ করলেন— উড়ন্ত চাকি বা উড়ন্ত পিরিচ।
কেউ কেউ অবশ্য বললেন, ওটা কেনেথের দৃষ্টি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। এ রকম কোনও অজানা বস্তু কখনও আকাশে ভাসতে পারে না। কিন্তু সেই সব তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের যাবতীয় ধ্যান-ধারণা, বিচার-বিশ্লেষণ একেবারে নস্যাত্ করে দিয়ে কেনটাকি রাজ্যের র্যাডিসন ভিল শহরের আকাশে ১৯৪৮ সালের ৭ জানুয়ারি আবার দেখা গেল ফ্লাইং সসার।
তখন সবেমাত্র দুপুর গড়িয়েছে। এক বন্ধুর সঙ্গে সামান্য ব্যাপার নিয়ে কথা কাটাকাটি হওয়ায় চব্বিশ বছরের তরুণী, এমিলির মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিছুই ভাল লাগছিল না তাঁর। তাই পার্কে এসে একটা বেঞ্চে একা-একা বসে ছিলেন। হঠাত্ তিনি দেখলেন, চাকতির মতো কী একটা জিনিস চক্কর মারতে মারতে তাঁর দিকেই ধেয়ে আসছে। ভয় পেয়ে তিনি চকার করে উঠলেন। রাস্তাঘাট তখন সুনসান। দুটো ছেলে সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। চিত্কার শুনে, তাঁরাও ওঁর মতো আকাশের দিতে তাকালেন। দেখলেন, একটা ফ্লাইং সসার ঘুরে বেড়াচ্ছে আকাশে। পড়ি কি মড়ি করে ছেলে দুটো ফুল স্পিডে সাইকেল চালিয়ে থানায় গিয়ে জানালেন ওটার কথা। পুলিশরাও ছুটে এলেন। দেখলেন, ছেলে দুটো মিথ্যে বলেননি। ততক্ষণে উড়ন্ত চাকি দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমে গেছে। পুলিশরা চেয়েছিলেন, শক্তিশালী দূরবিন দিয়ে ব্যাপারটা ভাল করে দেখতে। কিন্তু দূরবিন আনার আগেই সেগুলি উধাও। ফলে নিরাপত্তার কারণে পুলিশেরা তড়িঘড়ি জরুরি বার্তা পাঠালেন নিকটবর্তী সামরিক ঘাঁটি— ফোর্ট নক্সে।
এই নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে বিশাল হইচই হল। তার ক’দিন পরেই কেনটাকি থেকে খানিক দূরে গডম্যান এয়ারবেসের একজন পর্যবেক্ষক রোজকার মতো আকাশের উপরে নজরদারি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ আকাশের অনেক গভীর থেকে অস্বাভাবিক একটা লাল আভাকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে দেখে তিনি চমকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করলেন বড়কর্তাকে। বড়কর্তা কালবিলম্ব না করে ক্যাপ্টেন ম্যানটেলকে নির্দেশ দিলেন পুরো ব্যাপারটা সরজমিনে দেখে আসতে। ক্যাপ্টেন উড়োজাহাজ নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পাড়ি জমালেন আকাশে। প্রায় আঠারো হাজার ফুট উঁচুতে উঠে তিনি জানালেন, লাল আভাটা যার থেকে বেরোচ্ছে, ওটা আসলে ধাতু দিয়ে তৈরি অত্যাধুনিক একটা যান। আকারেও বিশাল বড়। আমার মনে হয়, এটা অন্য কোনও গ্রহ থেকে এসেছে। কারণ, আমি যত দূর জানি, এ রকম কোনও যান এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। ওটা এখন পাক খেতে খেতে উপরের দিকে উঠছে। আমিও ওটার পিছু পিছু যাচ্ছি। দেখে আসতে চাই, আসলে ওটা কী...
ব্যাস। লাইন কেটে গেল। একটু বাদে ক্যাপ্টেন আবার যোগাযোগ করলেন। জানালেন, আমি এখন মাটি থেকে অন্তত কুড়ি হাজার ফুট উপরে... হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু তার আগেই লাইনটা ফের কেটে গেল। তার পর তিনি আর কোনও যোগাযোগ করেননি। বিমানটিও ফিরে আসেনি।
মাঝে মাঝেই এই ভাবে আকাশের বুকে উড়ন্ত চাকির উদয় হয়, আবার মিলিয়েও যায়। লোকজন সেটাকে দেখতেও পায়। অথচ তাদের সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। অগত্যা সরকারি উদ্যোগে ইউ এস এয়ারফোর্সের টেকনিশিয়ানরা ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি একটি দল গঠন করলেন। ঠিক করলেন, সত্যি সত্যিই ফ্লাইং সসার বা গ্রহান্তরের কোনও যান বলে আদৌ কিছু আছে কি না, তাঁরা তার রহস্য উদ্ঘাটন করবেন। সেই দলে যেমন ছিলেন নামকরা, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ বৈমানিকেরা। তেমনি ছিলেন বেশ কয়েক জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানীও।
ওই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন লেফটেন্যান্ট জর্জ এফ নরম্যান। তিনি একদিন বিমান নিয়ে আকাশে উড়ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, আকাশের বুক চিরে একটি আলোর রেখা খুব দ্রুত গতিতে তাঁর দিকে ছুটে আসছে। যেন একটা জ্বলন্ত বর্শা। উনি আতঙ্কিত হলেন, ওটা তাঁর বিমানে আছড়ে পড়লে আর রক্ষে নেই। কিন্তু উনি সতর্ক হওয়ার আগেই ওটা তার গতিপথ ঝট করে পাল্টে নিল।
উনি ভেবেছিলেন, ওটা হয়তো খসে পড়া কোনও তারা কিংবা উল্কার কণা। কিন্তু ওটা যখন পাশ দিয়ে গেল, উনি নিঃসন্দেহ হলেন, ওটা আসলে একটা ফ্লাইং সসার। ফ্লাইং সসার নিয়েই তিনি গবেষণা করছেন। যাঁরা ফ্লাইং সসার দেখেছেন বলে দাবি করছেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করছেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তাঁদের বয়ান লিপিবদ্ধ করছেন। আর তাঁর চোখের সামনে দিয়ে আস্ত একটা ফ্লাইং সসার চলে যাবে, তিনি সেটা ছেড়ে দেবেন! এটা হতেই পারে না।
বিমানের মুখ ঘুরিয়ে ওটা থেকে ঠিকরে বেরোনো আলোর সরু রেখাটিকে তিনি অনুসরণ করতে লাগলেন। অনুসরণ করতে করতে মাটি থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উপরে উঠে গেলেন। উনি যত উঠছেন, ওটাও যেন তার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি স্পিডে আরও উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। সব চেয়ে বেশি স্পিড নিয়েও কিছুতেই তার কাছাকাছি ঘেঁষতে পারছেন না তিনি। মাঝপথে হুস করে চোখের নিমেষে কোথায় যেন উবে গেল সেটা। আর দেখা গেল না।
উড়ন্ত চাকি নিয়ে নানা লোকে নানা মন্তব্য করতে লাগলেন। ১৯৪৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর একজন দক্ষ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আকাশে বেলুন-উড়িয়ে নিজে তো অবাক হলেনই, তার সঙ্গে সঙ্গে একদম নতুন একটি তথ্য দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বললেন, শুক্র গ্রহে বসবাসকারী অতি বুদ্ধিমান জীবেরাই উড়ন্ত চাকি করে পৃথিবীতে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে। এখানকার সমস্ত খোঁজখবর নিচ্ছে। বলা যায় না, অদূর ভবিষ্যতে এরাই হয়তো পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করবে। আমাদের দাসানুদাস করে রাখবে।
কিন্তু এ কথা কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না, যিনি প্রথম ফ্লাইং সসার দেখেছিলেন, সেই জন অ্যাডাম স্কি। তিনি একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ফ্লাইং সসার নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। দিনের বেশির ভাগ সময় তো বটেই, মধ্যরাতে ছাদে উঠেও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যদি আবার ফ্লাইং সসার দেখা যায়! ১৯৫২ সালের ১৩ ডিসেম্বর দূরবিন দিয়ে আকাশ দেখছিলেন তিনি। আচমকা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা তীক্ষ্ণ আলো। দেখতে দেখতে মুহূর্তের মধ্যে আলোটা হয়ে গেল একটা স্পষ্ট উড়ন্ত চাকি। মনে হল, মাত্র কয়েকশো ফুট দূরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই সসারটা তার ছাদের উপর দিয়ে হুস করে উড়ে গেল। যাবার সময় হাতের মতো কিছু একটা বেরিয়ে কী যেন একটা তাঁর ছাদের উপরে টুক করে ফেলেও গেল।
কী ওটা? হাতে নিয়ে উনি দেখলেন, একটা ফিল্মের রোল। ডার্করুমে সেটা ডেভেলপ করে দেখা গেল, তাতে কোনও ছবি-টবি নেই। শুধুই কয়েকটি আঁকিবুঁকি। উনি বুঝতে পারলেন, ওদের ভাষায় ওরা কিছু লিখে পাঠিয়েছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও উনি সেটার পাঠোদ্ধার করতে পারলেন না।
এর আগে ১৯৫০-এর ২৭ এপ্রিল টিউবলিউয়ে এক বিখ্যাত বিমান কোম্পানির এক প্রবীণ চালক আকাশের বুক চিরে যেতে যেতে অদ্ভুত একটা লাল আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পেলেন। তাঁর মনে হল, বিরাট বড় একটা লাল আলোর বল যেন এক দিক থেকে আর এক দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে। তিনি তাঁর কো-পাইলট রবার্ট অ্যালিকেসকে ব্যাপারটা ভাল করে দেখতে বললেন। অ্যালিকেসও বুঝতে পারলেন না, ওটা কী! তাই সঙ্গে সঙ্গে শিকাগো কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাইলেন, তাঁদের কাছাকাছি কোনও বিমান উড়ছে কি না, বা কোনও বিমান ভুলবশত তাঁদের বিমানের কাছাকাছি চলে এসেছে কি না।
কন্ট্রোল টাওয়ার জানাল, তাঁদের ত্রিসীমানার মধ্যে কোনও বিমান তো দূরের কথা, একটা পাখিও উড়ছে না। তাই ওটা কী, তা দেখার জন্য লাল বলটার পিছু নিলেন তাঁরা। কিন্তু পিছু নেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল আলোর বলটা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেল। তার আগে অবশ্য হুমড়ি খেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত প্রায় সমস্ত যাত্রীই বিমানের জানালা দিয়ে দেখে নিলেন সেই লাল বলটিকে। বিমান থেকে নেমে তাঁরা সবাই একবাক্যে বললেন, ওটা নিশ্চয়ই কোনও ফ্লাইং সসার ছিল।
একবার ডার্বিশায়ারের একটি পল্লিতে টহল দেওয়ার সময় দুজন পুলিশ অফিসার দেখেছিলেন, আকাশের বুকে একটা বিশাল বড় সিগার ঝুলছে। মুখের কাছে ধিকধিক করে জ্বলছে আগুন। সেই আগুন থেকে মাঝে মধ্যেই বিচিত্র বাহারের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকে ছিটকে বেরোচ্ছে।
সিগার নয়, রয়্যাল এয়ারফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এরিক কক্স গাড়ি ড্রাইভ করে হ্যাম্পশায়ারের ক্যামনাম থেকে পেলিং বিচে যাওয়ার সময় একটা-দুটো নয়, একসঙ্গে সাত-সাতটা আলোক পিণ্ডকে দেখেছিলেন আকাশে। সপ্তর্ষি মণ্ডলের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলোক পিণ্ডগুলি নিজেদের অবস্থান এ দিক ও দিক করে কখনও ইংরাজির ‘ভি’ আবার কখনও ‘ক্রশ চিহ্ন’র আকার নিয়ে উড়তে উড়তে নিজেদের রং বদলাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে যখনই কোনও উড়ন্ত চাকি এই পৃথিবীতে আসে, তখনই নাকি দেখা যায় এই ধরনের আলোর কারিকুরি।
১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি একটি দিনে ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই এক উড ফার্মের কর্মী ক্রিস্টোফার গারনা-সহ দুজন কনস্টেবল একসঙ্গে দেখেছিলেন লাল মতো একটা আলোক পিণ্ড। সেটা আকাশের এক দিক থেকে অন্য দিকে নাচতে নাচতে যাচ্ছিল। যেতে যেতে সেটার রং হলুদ হয়ে যাচ্ছিল। আর হলুদ হওয়ামাত্র তা থেকে ফুলঝুরির মতো ছোট ছোট আলোর ফুলকি ছিটকে ছিটকে বেরোচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আকাশের বুকে বুঝি আতসবাজির ভেল্কি লেগেছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ সেটা সবুজ হয়ে গেল।
তখন লাল হত। হলুদ হত। সবুজ হত। আরও কী কী রং হত ওঁদের হয়তো সেটা দেখা হয়নি। কিন্তু এই চার তলার প্রকাণ্ড সাবেকি জানালা থেকে সামনের তিন তলার বাড়ির ছাদে, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে জুরান যে আলোটাকে চায়ের কেটলির মতো দেখতে জলের ট্যাঙ্কের আড়াল থেকে উঁকি মারতে দেখছে, সেটার রং ভারী অদ্ভুত। কেমন যেন মায়াবী মায়াবী।
জুরানের হঠাৎ মনে হল, তা হলে কি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন, প্যারিস ছেড়ে ভিন্ গ্রহবাসীরা এখন ভারতে আসতে শুরু করেছে!
(তিন)
জুরান অবাক হয়ে দেখল, আলোক পিণ্ডটা খুব ধীরে ধীরে গড়াতে গড়াতে ছাদের মাঝখানে এসে থমকে দাঁড়াল। তার পর হঠাত্ কেমন যেন কুয়াশা কুয়াশা হয়ে ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী হয়ে গেল। সেই কুণ্ডলী থেকে ধূপকাঠির ধোঁয়ার মতো একদম সরু একটা রেখা এঁকেবেঁকে উঠতে উঠতে মানুষের একটা অবয়বের রেখাচিত্র তৈরি করতে লাগল।
জুরান একেবারে থ’ হয়ে গেল। এ রকম আবার হয় নাকি! সে ভুল দেখছে না তো! নাকি চোখ তার সঙ্গে মশকরা করছে। মাঝে মাঝে তার এ রকম হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা সে দেখতে পায়, রাবণের ছেলে মেঘনাথ ঝলমলে রাজপোশাক পরে পুষ্পরথে করে মেঘের আড়াল থেকে এক ধুন্ধুমার যুদ্ধ করছে। দেখতে পায়, এক-একটা মন্ত্রপূত তির ছিলা থেকে বেরিয়ে ছুটে যেতে যেতে কী ভাবে সাতটা, সতেরোটা, সাতাশটা, সাঁইত্রিশটা হয়ে যাচ্ছে। ঝাঁক বেঁধে বেঁধে ছুটে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে থাকা শত্রুপক্ষের শত শত সৈনিকের দিকে।
আবার কখনও সখনও উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা মন্ত্র-পড়া বাণের সঙ্গে ওই তিরের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে যাচ্ছে মহা বিস্ফোরণ। তার বিন্দু বিন্দু স্ফুলিঙ্গ ছিটকে ছিটকে ছড়িয়ে পড়ছে মহাশূন্যে। সেগুলি হয়ে যাচ্ছে এক-একটা গ্রহ, নক্ষত্র, তারা। কেঁপে উঠছে পাহাড়। উথালপাথালি খাচ্ছে সমুদ্র। শুরু হয়ে যাচ্ছে ঝড়ঝঞ্ঝা, মহাপ্রলয়। দেখে মনে হয়, এ বার বুঝি পৃথিবীটা গেল!
এই তো দিন কতক আগে বাবার সঙ্গে তাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে একটা পার্কে গিয়েছিল ও। সেই পার্কে কলকাতা পুরসভা থেকে সাত দিন ধরে এক পুষ্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। পোস্টারে-পোস্টারে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল গোটা এলাকা। অটো করে হ্যান্ডবিল ছড়ানো হয়েছিল পথ-চলতি লোকেদের হাতে-হাতে। মাইকেও বারবার ঘোষণা করা হয়েছিল এই পুষ্প প্রদর্শনীর কথা। কিন্তু সর্বত্র ‘পুষ্প প্রদর্শনী’ বলা হলেও ওই প্রদর্শনীতে আনাজপাতি থেকে শুরু করে ফলমূলও খুব একটা কম ছিল না। তবে সেগুলি ছিল একটু ব্যতিক্রমী। বিভিন্ন অঞ্চলে ফলন প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হওয়া, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অতি যত্নে তৈরি করা চাষিদের এক-একটা চোখ ধাঁধানো সৃষ্টি।
একটা বিশাল চালকুমড়ো বাঁশের ঠেকনা দিয়ে দাঁড় করানো ছিল। এত বড় চালকুমড়ো জীবনে সে দেখেনি। মাপলে তার চেয়েও লম্বা হবে। ওটা দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখে, তার পাশেই একটা মাখনসিম গাছ। দেখে তো সে একেবারে হাঁ। শুরুটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু শেষটা কোথায়! ও দেখার চেষ্টা করল। দেখল, লতানো গাছটা এঁকেবেঁকে এই টবের ফাঁক দিয়ে, ওই গাছের পিছন দিয়ে, এ দিক দিয়ে ও দিক দিয়ে কোথায় গিয়ে যে শেষ হয়েছে, দেখা যাচ্ছে না। ক’হাত লম্বা হবে কে জানে!
একটা বাতাবি লেবু ছিল ইয়া বড়। শ্রাবণ মাসে শিবের মাথায় জল ঢেলে তারকেশ্বর থেকে ফেরার পথে অত বড় বড় কুমড়ো দেখে, যারা শুধু খাওয়ার জন্য নয়, কেবলমাত্র আশপাশের লোকজনদের তাক লাগিয়ে দেবার জন্য কুড়ি কিলো-পঁচিশ কিলো ওজনের অমন এক-একটা কুমড়ো কাঁধে করে বয়ে আনে, একেবারে সে রকম।
একটা চন্দ্রমুখী আলু ছিল। এত বড় যে তার পক্ষে দু’হাত দিয়েও সেটা তোলা সম্ভব নয়। ষোলো কিলোর ওপর ওজন। একটা ক্যাপসিকাম ছিল একেবারে গাঢ় নীল রঙের। মনে হয়, কেউ বুঝি এক্ষুনি নীল রং লেপে দিয়ে গেছে। আর ফুলগুলি? এক-একটা গাঁদা ফুল যেন বড় মাপের এক-একটা বাঁধাকপি। জিনিয়া ফুলগুলির প্রতিটি পাপড়িই একেবারে কলাপাতার মতো ঢাউস-ঢাউস।
ওর বাবা দেখতে দেখতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ও ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। দেখল, সামনেই বনসাইয়ের মতো ছোট্ট একটা ঝাঁকড়া গাছ। সেই গাছে ছোট ছোট অসংখ্য ডাল। আর প্রত্যেকটা ডালের মাথাতেই এক থোকা করে জুঁই ফুল ফুটে আছে। ফুলের ভারে নুইয়ে পড়েছে ডালগুলি। প্রতিটি থোকার অগুনতি ফুলের প্রত্যেকটা ফুলই এক-একটা এক এক রঙের। একটা জুঁই আকাশি, তো একটা জুঁই টকটকে লাল। একটা জুঁই ক্রিম রঙের তো একটা জুঁই পুরো সবুজ।
জুরান বিস্মিত হয়ে দেখছিল। এ রকম ফুল এর আগে ও কখনও দেখেনি। হঠাৎ দেখে, ওই ছোট্ট ছোট্ট জুঁই ফুলগুলি আচমকা নড়েচড়ে উঠল। শুধু নড়াচড়াই নয়, তাদের ছোট্ট ছোট্ট পাপড়িগুলিকে ডানার মতো মেলে দিয়ে গাছটার ঝাঁকড়া মাথার চার পাশে ঘুরে ঘুরে উড়তে লাগল ওরা। ঠিক দেখছে তো সে! চোখ-টোখ কচলে ও ভাল করে দেখল, না। ওগুলো প্রজাপতি নয়। ওগুলো ওই গাছটারই রং-বেরঙের ফুল। উড়তে উড়তে সেই ফুলগুলি ফের আগের জায়গায় স্থির হয়ে বসতেই গাছের বাকি ফুলগুলি আগের ফুলগুলির মতোই ডানা মেলে দিল।
জুরানের মনে হল, পড়তে বসলে তার যেমন হয়, একটানা বসে থাকতে থাকতে পা ঝিনঝিন করে। মনে হয়, টুক করে এ দিক ও দিক থেকে একটু ঘুরে আসি। ঠিক তেমনি, একই ভাবে স্থির হয়ে গাছের ডালের মাথায় ঝুলে থাকতে থাকতে ওদেরও বুঝি হাঁফ ধরে গেছে। তাই পালা করে মাঝে মাঝেই উড়ে গিয়ে ওরা বোধহয় ওদের হাত-পায়ের খিলগুলি একটু ছাড়িয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু ও যা দেখল, সেটা যদি ও কাউকে বলে, কেউ কি ওর কথা বিশ্বাস করবে! গাছ থেকে ফুলেরা উড়ে গিয়ে খানিকক্ষণ ঘুরে এসে আগের মতোই ফের ফুল হয়ে বসে পড়ে! নিশ্চয়ই কেউ বিশ্বাস করবে না। ভাববে, বানিয়ে বানিয়ে বলছি। আচ্ছা, দু’-একজনকে সাক্ষী রাখলে হয় না! যে-ই না এটা ওর মনে হয়েছে, অমনি অন্তত একজনকে সাক্ষী রাখার জন্য পাশ ফিরতেই ও অবাক হয়ে গেল। এ কী! কাকে ডেকে সে দেখাবে এই দৃশ্য! তার আশপাশে যে কেউই নেই। না, একটা বাচ্চাও না। অথচ অন্য গাছগুলোর কাছে ভিড় যেন উপছে পড়ছে। এটা কী করে হয়!
জুরান যখন এ সব ভাবছে, হঠাৎ তার নাকে ভেসে এল একটা ভারী সুন্দর গন্ধ। গন্ধটা তার চার পাশে ম ম করতে লাগল। না, এটা তো কোনও ফুলের গন্ধ না! কারও গায়ে দিয়ে আসা সেন্টের গন্ধও না! তা হলে এটা কীসের গন্ধ! কীসের! এ গন্ধ এর আগে তো সে কোনও দিন পায়নি!
চার তলার ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ঘরের মধ্যে খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ও। একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল সামনের বাড়ির তিন তলার ছাদের দিকে। সেই ছাদের উপরে খোলা আকাশের নীচে তখন ধোঁয়া হয়ে যাওয়া আলোক-পিণ্ডটা থেকে সরু সুতোর মতো একটা ধোঁয়ার রেখা এঁকেবেঁকে উঠে অবিকল মানুষের মতো একটা রেখাচিত্র তৈরি করছে। সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই গন্ধটাই ভেসে এল তার নাকে।
বাঃ, দারুণ তো গন্ধটা। কী সুন্দর! বুক ভরে সেটা নেওয়ার জন্য জুরান খুব জোরে শ্বাস নিতেই ও বাড়ির ছাদ থেকে আলোর তৈরি মানুষের রেখাচিত্রটা যেন হুস করে তাদের বিশাল জানালার সিকের ফাঁক গলে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল।
যে জানালাটা বিক্রি হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষের ভিটে থেকে তার বাবা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রোমোটারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছিলেন। অনেক কষ্ট-কসরত করে এই ফ্ল্যাটে লাগিয়েছিলেন। যে জানালা দিয়ে হু হু করে হাওয়া এসে ঘরের সব জিনিসপত্র প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। সেই হাওয়ায় ভেসে তার বাবা মাঝে মাঝেই পৌঁছে যান তাদের পূর্বপুরুষের সেই পাঁচমহলা বাড়িতে। ফিরে যান তাঁর ছেলেবেলায়। খুঁজে পান পুরনো সেই সব দিন। দেখা হয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলাকার সেই সব বন্ধুদের সঙ্গে।
তাদের ঘরের দরজার চেয়েও বড়, খড়খড়ি লাগানো সেই বিশাল জানালার পাল্লা দুটো খোলাই ছিল। সেই জানালায় চার আঙুল দূরে দূরে পর পর লোহার সিক লাগানো। নীচ থেকে একদম উপর পর্যন্ত। লাগানোর পরে সেগুলিকে কোনও দিন রং করা হয়েছিল কি না, বোঝা মুশকিল। মরচে পড়ে, চলটা-টলটা উঠে এখন কেমন যেন খরখরে হয়ে গেছে। মুঠো করে ধরলে উঠে থাকা ছুঁচোলো চলটাগুলো হাতের তালুতে গেঁথে যায়। তবুও সময় পেলেই ওটার সামনে এসে দাঁড়ান জুরানের বাবা। জুরানও। ওটার সামনে দাঁড়ালে দূর থেকে যে কোনও লোকেরই মনে হতে পারে, ওদের বুঝি কেউ কয়েদ করে রেখেছে।
সেই জানালা দিয়েই ও-বাড়ির ছাদ থেকে আলোর রেখাচিত্র দিয়ে আঁকা মানুষটা দুম করে ঢুকে পড়ল তার ঘরে। সে আসতেই ঘরের সমস্ত অন্ধকার ঘুচে গেল। আলোয় ঝলমল করে উঠল সব। তার গা থেকে এত আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে যে, তার দিকে ঠিক মতো তাকানোই যাচ্ছে না। দেখাই যাচ্ছে না তাকে। শুধু আলো আলো আর আলো। যে ভাবে ওখান থেকে সে ঝপ করে চলে এল, তাতে জুরানের মনে হল, ও নিশ্চয়ই কোনও ভেলকি জানে। ভেলকি না হলেও কোনও না-কোনও মন্ত্র জানে। যেমন গুপি গাইন বাঘা বাইনে ভূতের দেওয়া তিন বরের মধ্যে একটা ছিল জুতো। সেই জুতো পায়ে গলিয়ে যেখানে খুশি যেতে পারত গুপি আর বাঘা। সেই রকম কোনও জুতো বা ওই জাতীয় কোনও কিছু নিশ্চয়ই তার আছে, আর সে সব যদি না-ই থাকে, তা হলে অন্তত এক জোড়া ডানা তার অবশ্যই আছে। পাখি-টাখি ছাড়া, একমাত্র পক্ষিরাজ ঘোড়া আর পরিদেরই তো ডানা থাকে। এ যখন কোনও ঘোড়া-টোড়া নয়,তা হলে এ কি কোনও ছদ্মবেশী পরি!
হতেই পারে! সারা পৃথিবী যখন ঘুমে বিভোর হয়ে থাকে, তখন নাকি দল বেঁধে পরিরা ডানা মেলে দেয় আকাশে। ভেসে যেতে যেতে মনোরম কোনও পাহাড়ের কোল বা পাহাড়ি ঝর্না অথবা ঝকঝকে কোনও জলাশয় কিংবা ফুলে-ফুলে ঢাকা কোনও বাগান তাদের চোখে পড়লেই, তারা পৃথিবীতে নেমে আসে। নেমে আসে ফুলের মতো ফুটফুটে বাচ্চা দেখলেও। তাকে আদর করে আবার ভেসে যায় আকাশে। তা হলে কি এ তাকে কোনও ছোট্ট বাচ্চা ভেবেছে!
ভাবতেই পারে! কিছু কিছু শব্দ আছে, লোকভেদে বা অবস্থা অনুযায়ী সেগুলি পাল্টে যায়। যেমন ‘কিছু’। এটা ভারী অদ্ভুত একটা শব্দ। একজনের কাছে ‘কিছু’ মানে এক মুঠো। আবার আর একজনের কাছে সেই ‘কিছু’ মানেই— এক ধামা। এই একই ভাবে ‘সামান্য’ পথ মানে কারও কাছে খুব বেশি হলে দশ পা দূরে, তো কারও কাছে আবার বারো ক্রোশ পথও— এই তো এখানে। ঠিক তেমনি, কারও কাছে বাচ্চা মানে খুব বেশি হলে ছ’মাসের শিশু। আবার কারও কাছে দশ বছরের বালকও একরত্তি ছেলে। আর মায়ের কাছে তো রিটায়ার হয়ে যাওয়া বুড়ো খোকাও একেবারে দুধের বাচ্চা। লোক অনুযায়ী সব শব্দেরই তারতম্য ঘটে। তা হলে কি এখানেও সে রকম কিছু ঘটেছে! এই পরিটা তাকে বাচ্চা ঠাওরেছে!
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জুরানের মাথার মধ্যে ঝিলিক মেরে উঠল এই রকম হাজারখানেক ভাবনা। কিন্তু সত্যিটা যে কি, সেটা বুঝে ওঠার আগেই মানুষের আদল-মার্কা আলোর রেখাচিত্রটা শতরঞ্চির মতো টানটান হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে র্যাপারের মতো মুড়ে ফেলল তাকে। তার পরেই সাঁ সাঁ শব্দ। জেট গতিতে ছুটতে লাগল একেবারে আকাশের দিকে। তাকে মুড়লেও তার মাথার দিকে আর পায়ের দিকের বাড়তি অংশটা বুঝি মোড়া হয়নি। তাই মাথার দিকের ওই জায়গা দিয়ে হু হু করে ঢুকতে লাগল শীতল বাতাস। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথা আর কানের লতি-টলিগুলো অবশ হয়ে গেল। এতটাই অবশ, যেন পিন ফোটালেও তার আর লাগবে না। তা না লাগুক, খুব ভাল কথা। কিন্তু যে ভাবে মোড়কটা আকাশ ভেদ করে ছুটছে, উপর থেকে বাতাসের এই প্রবল চাপে মোড়কের নীচের খোলা জায়গাটা দিয়ে সে আবার পড়ে যাবে না তো! তা হলে তো একেবারে সাড়ে সর্বনাশ। কোথায় গিয়ে যে পড়বে, কে জানে!
এত জোরে যখন মোড়কের মধ্যে হাওয়া ঢুকছে, তার মানে তাকে নিয়ে এই মোড়কটা কোনও খোলা জায়গা দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, সে জানে না। তবে এটা বুঝতে পারছে, তাকে নিয়ে যখন যাচ্ছে, তখন কোথাও না-কোথাও নিয়ে গিয়ে তো তাকে ফেলবে। কিন্তু কোথায়!
তা ছাড়া, তাকে এ ভাবে নিয়ে যাওয়ার মানেই বা কী! তা হলে কি কেউ তাকে অপহরণ করল! কোন সিনেমা! এখন আর তার নাম মনে পড়ছে না। তবে তার বেশ মনে আছে, সেই সিনেমাটায় সে দেখেছিল, ভিন্গ্রহ থেকে এক দল অদ্ভুত-দর্শন প্রাণী পৃথিবীতে এসে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে ঠিক এ ভাবেই এক-একজনকে আগাপাছতলা মুড়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিল ওদের গ্রহে।
সেখানকার অত্যাধুনিক পরীক্ষাগারে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছিল, তাদের আই কিউ, বুদ্ধি, মানসিকতা, সহনশীলতা এবং বার বার যেটা যাচাই করেছিল, সেটা হল, পৃথিবীর মানুষ তাদের পক্ষে কতটা বিপজ্জনক।
এই ভাবে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করে, যেখান থেকে যাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেখানেই রেখে দিয়ে গিয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে। তার আগে অবশ্য নিয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরে পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাটাই ডিলিট করে দিয়েছিল তাদের মস্তিস্ক থেকে।
তবে কি সে রকমই কোনও ভিন্ গ্রহবাসী তাকে কিডন্যাপ করল! কিন্তু এত জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিমান মানুষ থাকতে ওরা হঠাৎ করে তাকেই বা অপহরণের জন্য বেছে নিল কেন! নাকি বাছাবাছির কোনও বালাই নেই। জানালার সামনে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, যেতে যেতে হাতের কাছে পেয়েছে বলে, তাকে তুলে নিয়েছে! কে জানে!
এই রকম একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েও মায়ের জন্য মনটা বড় হাহাকার করে উঠল জুরানের। সকালে উঠে তাকে বিছানায় না দেখলে তার মা যে পাগল হয়ে যাবে। তা হলে! কী করবে সে! কী করবে!
(চার)
অসহ্য এক কান্নায় ডুকরে উঠতেই জুরানের শরীরটা বুঝি থরথর করে কেঁপে উঠেছিল। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শরীরটাও হয়তো একটু সঙ্কুচিত আর প্রসারিত হচ্ছিল, তাই তাকে ধরে রাখার আঁটোসাঁটো ভাবটা যাতে ইলাস্টিকের মতো তার শরীরে চেপে না-বসে, দম নেওয়ার জন্য তাকে যাতে হাঁসফাঁস করতে না-হয়, তার জন্য মোড়কটা বোধহয় নিজেকে একটু শিথিল করেছিল। আর তাতেই কী ভাবে যেন মোড়কের তলা দিয়ে সুড়ুৎ করে গলে জুরান পড়তে লাগল একেবারে নীচে। সোজা নীচে।
পড়ছে তো পড়ছেই। পড়ছে তো পড়ছেই। পড়ছে তো পড়ছেই। মাটি ছুঁতে যখন আর কয়েক মুহূর্ত বাকি, ঠিক তখনই সাঁ... আ... আ... আ... করে এসে কে যেন তাকে একেবারে চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিল।
কে! কে তুলল তাকে! এ দিকে ও দিকে তাকাল জুরান। না। আশপাশে কেউ নেই। তাকে কেউ হাত ধরে টেনেও তুলছে না। কোলপাঁজা করে তো নয়ই। জাল ফেলে মাছ তোলার মতো কেউ তাকে কোনও কিছু করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে না তো! সন্দেহ হতেই, নিজের শরীরটাকে একবার ভাল করে দেখল সে। না। তাও নয়। আলোর কোনও রশ্মিও তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে না। তার মানে গত কাল টিভিতে দেখা স্পাইডারম্যান নয়, তাকে বাঁচিয়েছে, ছোটবেলায় যার ভক্ত ছিল সে, যাকে নকল করে উপর দিকে হাত তুলে সে বনবন করে ঘুরত, সে-ই শক্তিমান। কিংবা তার এখনকার সব চেয়ে প্রিয় চরিত্র— সুপারম্যান। না হলে কে বাঁচাল তাকে? কে?
সে যে-ই হোক না কেন, নিশ্চিত মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে যে তাকে বাঁচাল, আর যা-ই হোক, সে নিশ্চয়ই তার কোনও ক্ষতি করবে না। এতক্ষণ ধরে তার ভিতরে যা হচ্ছিল, একমাত্র সে-ই জানে। তাই মৃত্যুর আতঙ্ক কেটে যেতেই ভয়ে এতক্ষণ সিঁটিয়ে থাকা শরীরটাকে আলতো করে ছেড়ে দিল সে। আর যার উপর ভরসা করে শরীরটা ছেড়ে দিল, সেটা তখন চোখের পলকে এক চিলতে সাদা ধবধবে মেঘ হয়ে তাকে দু’হাতে আগলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল মহাশূন্যের অলিগলি, তস্যগলি দিয়ে এক অচেনা-অজানা জায়গায়।
জায়গাটা ভারী অদ্ভুত। এত রাতেও চারিদিকে ফটফট করছে মিষ্টি আলো। আলো! না, জ্যোত্স্না! এত অঢেল জ্যোৎস্না যখন, তখন নিশ্চয়ই চাঁদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে সে! হতেই পারে! তা না হলে, এখানে এত জ্যোৎস্না এল কী করে! আশপাশে তাকাল সে। যত দূরে চোখ গেল, দেখল চার পাশে শুধু পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।
যে মেঘটার উপরে সে বসে আছে, সেখানে ছোট-বড় বিভিন্ন মাপের কত কিছু ছড়ানো-ছেটানো। অথচ এত দিন ধরে সে যত রকমের আদল দেখেছে, তার সঙ্গে এগুলোর কোনও মিল নেই। বোঝাও যাচ্ছে না এগুলো কী! রংগুলিও কেমন যেন! যেহেতু সে ছবি আঁকে, সে জানে, সাতটি রংই শুধু নয়, সেই রংগুলি কম-বেশি করে মিশিয়ে-মিশিয়েও কিছুতেই এই শেড তৈরি করা যাবে না। তাই সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, এ কোথায় এলাম রে বাবা!
যে-ই তার এটা মনে হয়েছে, অমনি কে যেন সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল— তোমাকে অন্য কোথাও আনিনি। তুমি এই মহাশূন্যেই আছ।
— মহাশূন্যে! মানে! তার মানে আমি পৃথিবীতে নেই? সেটা কী করে হয়! শুধু পৃথিবীতে নয়, আমাদের দেশেই তো কত রকমের ভাষা। এক জায়গার ভাষা আর এক জায়গার লোক বুঝতে পারে না। আর এটা যদি পৃথিবীর মধ্যেই না-হয়, তা হলে তুমি আমার ভাষা বুঝছ কী করে? আর সেই ভাষায় কথাই বা বলছ কী করে?
— কারণ, আমার কাছে ভাষা কোনও সমস্যা নয়। আমাকে যে-ভাষাতেই যে-কেউ যাই বলুক না কেন, সেটা যখন আমার কান ভেদ করে মরমে পৌঁছবে, তখন সেটা আমার ভাষায় ভাষান্তর হয়েই পৌঁছবে। ঠিক সেই একই ভাবে, আমি যা বলব এবং যাকে বলব, তার কাছে সেটা তার ভাষাতেই রূপান্তর হয়ে পৌঁছবে। তাই আমি আমার ভাষাতে কথা বললেও তোমার মনে হচ্ছে, আমি বুঝি তোমার ভাষাতেই কথা বলছি। আসলে তুমি এত দিন যার উপরে ছিলে, তোমাদের ওই পৃথিবী যার মধ্যে ভেসে আছে, তুমি কিন্তু সেই মহাশূনেই আছ।
— তুমি কে?
— আমি সময়।
— সময় মানে?
— সময় মানে সময়। টাইম। এই মহাশূন্যে যা যা ঘটে, সব কিছুই আগে থেকে ঠিক করা থাকে। ঠিক করা আছে আমরা কে কখন কোন গ্রহে যাব, তাও।
— তার মানে?
— মানে, আমরা হলাম এক-একটা সময়-কণা। ঠিক আছে, তোমাকে একটু সহজ করে বোঝাই। পর পর পুঁতি গেঁথে যেমন মালা হয়, তেমনি আমাদের মতো সময়-কণা পর পর সারি বেঁধে দাঁড়ালে হয়— সময়। আমরা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের একটা গভীর যোগসূত্র আছে। যেমন ধরো... তোমাদের হিসেব অনুযায়ী, তোমাদের পৃথিবীতে এখন একবিংশ শতাব্দী চলছে। সেই হিসেব অনুযায়ী আমি হলাম স্ত্রিংশত্তম শতাব্দী। অর্থাৎ তিন হাজার তিনশো বছর। মানে, তোমাদের ওখানে পৌঁছতে আমার এখনও এক হাজার দুশো বছর বাকি। এই যে চার পাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘকে ভেসে বেড়াতে দেখছ, এরা কিন্তু কেউই মেঘ নয়, সবাই-ই আমার মতো এক-একটা সময়-কণা। কেউ আমার আগে যাবে। কেউ বা পরে। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই কখনও না-কখনও বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রে যেমন যাব, তেমনি তোমাদের পৃথিবীতেও যাব।
— যাবেই যখন, তা হলে এখন যাচ্ছ না কেন?
— আগে যাওয়া যাবে না। যার যখন যাওয়ার কথা, সে কেবল তখনই যেতে পারবে। তার আগে নয়। বিশাল লম্বা লাইন আছে যে। হাজার চেষ্টা করলেও কেউ আগে যেতে পারবে না। কেউ কাউকে লাইনের মধ্যে ঢুকতেও দেবে না। আবার যার যখন সময় হবে, তাকে কেউ আটকেও রাখতে পারবে না। আবার সময় হলেও, কেউ যে নিজের ইচ্ছে মতো হুট করে সেখানে গিয়ে হামলে পড়বে, তাও হবে না।
— কেন?
— কারণ, আমরা তো এক-একটা ক্ষণ। তাই আগের ক্ষণ না যাওয়া অবধি পরের ক্ষণ কিছুতেই যেতে পারে না। এটাই নিয়ম। এই নিয়ম কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না। আসলে আমরা লাইন দিয়ে প্রতি মুহূর্তে একের পর এক ছুটে যাচ্ছি। আমরা যে যখন যেখানে যাই, সেখানে গিয়ে এক-একটা ঘটনা ঘটাই। হয় তাদের এক ধাপ এগিয়ে দিই। নয়তো এক ধাপ পিছিয়ে দিই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটোই ঘটাই। একটার সঙ্গে আর একটা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে থাকে। কেউ বুঝতে পারে, কেউ পারে না। যেমন ধরো, আমার মতোই একটা ক্ষণ যখন তোমাদের পৃথিবীতে গিয়ে পৌঁছল, তখন তোমরা তার হাত ধরে শিকার করতে শিখলে। শিকারের সঙ্গে সঙ্গে একই সঙ্গে শিখলে হত্যা করা। তার পরে যখন আর একটা সময় তোমাদের ওখানে গেল, তোমরা আগুন জ্বালাতে শিখলে। কিন্তু জানতেও পারলে না, আগুন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে ওই পৃথিবীটাকে তোমরা কত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে দিতে লাগলে। কতটা কলুসিত করে দিতে লাগলে। কতটা দূষণে-দূষণে ভরিয়ে দিতে লাগলে চারিদিক। নিজেদের অজান্তে নিজেরাই নিজেদের মৃত্যুর পথ তৈরি করতে লাগলে।
তার পর আর একটা সময় যখন তোমাদের গ্রহে গেল, সে তোমাদের শূন্য ব্যবহার করতে শেখাল। পৃথিবীর মানুষকে এক ধাক্কায় প্রায় কয়েক ক্রোশ এগিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের এতটাই হিসেবি করে তুলল যে, নিজের আখের গোছানো ছাড়া মানুষ সব ভুলে গেল। এগোবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে মানবিক ভাবে পিছিয়ে দিল সহস্র যোজন।
ঠিক এই ভাবেই, আমার মতোই এক সময়-কণা তোমাদের গ্রহে পা রেখেই, তোমারা যাতে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করতে পারো, সে জন্য তোমাদের উপহার দিল— ডিনামাইট। পরে তোমরা সেটাকেই যুদ্ধের সময় মানুষ খতম করার জন্য মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করলে। ঠিক তেমনি, তার পর যখন আরও একটা সময়-কণা তোমাদের পৃথিবীতে হাজির হল, সে তোমাদের জানিয়ে দিল, গাছেদেরও প্রাণ আছে।
— গাছেদের প্রাণ আছে! তোমরা কোথায়? সেটা তো জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছেন। আমি পড়েছি। আমাদের বিজ্ঞান বইতে আছে। জুরান প্রতিবাদ করে উঠল।
সময়-কণা বলল, আরে বাবা, সে কি আমি জানি না? আমি বলছি, কে আবিষ্কার করল, সেটা বড় কথা নয়। কোন সময়ে আবিষ্কার হল সেটাই বড় কথা। সময়টাই আসল। তার আগে কি ও রকম কোনও বিজ্ঞানী পৃথিবীতে জন্মাননি? না, গাছেদের প্রাণ আছে, এটা কারও মাথায় আসেনি? এসেছে। আর এসেছে দেখেই তো হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তোমাদের বিভিন্ন পুরাণে, লোককথায় বারবার গাছেদের নানান কীর্তিকলাপের কথা উঠে এসেছে। মহাকাব্যে আছে, মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার জন্য তুলসী গাছকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল, কুকুর তার গায়ে হিসি করবে।
পুরাণে আছে, মৃত দেহ পোড়ানোর সময় যে-ধোঁয়া আর ছাই ওড়ে, মৃত মানুষের প্রাণ তার সঙ্গেই উড়ে গিয়ে ধানখেতের মাথায় ঠাঁই নেয়। আর তোমরা তো জানোই, ধান থেকে চাল হয়। আর সেই চাল রান্না করে ভাত হয়। সেই ভাত খাওয়ার ফলেই মায়েদের কোল আলো করে ফের জন্ম নেয় সেই প্রাণ।
এত কিছুর পরেও কেউই কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারেনি, গাছেদের প্রাণ আছে। ফলে কে আবিষ্কার করল, সেটা বড় কথা নয়। কথা হচ্ছে, ওই সময়েই ওই কথাটা তোমাদের ওখানকার লোকেদের জানার কথা ছিল, তাই তখন জেনেছ। সুতরাং সময়টাই হল আসল। সময় না হলে কিচ্ছু হয় না। কিচ্ছু না।
অবাক হয়ে গেল জুরান, তাই?
— হ্যাঁ, তাই।
— তা হলে তুমি যখন পৃথিবীতে যাবে, তখন তুমি পৃথিবীর মানুষকে কী শেখাবে?
— আমি শেখাব, হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকার কৌশল।
— হাজার হাজার বছর! সেটা আবার হয় নাকি?
— কেন হবে না? এই মহাশূন্যে কিছুই অসম্ভব নয়। শুধু সময়ের অপেক্ষা। আজ যেটা অসম্ভব-অবান্তর, কাল যখন আর একটা সময় গিয়ে হাজির হবে, তখন সেটাই খুব স্বাভাবিক এবং সহজ ব্যাপার হয়ে যাবে।
— কিন্তু কী করে?
— যে পদ্ধতিতে এখন তোমাদের পৃথিবীতে ব্লাড ট্রান্সফিউশন হয়, একজনের কিডনি আর একজনের দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়, ঠিক সেই ভাবেই একজনের আয়ু আর একজনের মধ্যে ভরে দেওয়া হবে। মনে রেখো, এক গ্রাম সোনার দাম তখন যত লক্ষ টাকাই হোক না কেন, শুধু দূর থেকে এক ঝলক দেখার জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত বলয়ে এক চিলতে সোনা, যতই জাদুঘরে রাখা হোক না কেন, তখন কিন্তু সোনা-দানা, হিরে-জহরত নয়, পৃথিবীতে সব চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠবে— আয়ু। তখন আয়ু কেনাবেচা হবে। যারা মনে করবে, অত বছর বেঁচে থেকে লাভ কি? যে ক’বছর বাঁচব, রাজার মতো বাঁচব। তারা তাদের জীবনের কিছুটা আয়ু নিলামে তুলে বিপুল দামে বিক্রি করে দেবে। আর যারা মনে করবে, যত কষ্টই হোক, একবার যখন পৃথিবীতে এসেছি, তখন যত দিন পারব, এই পৃথিবীতেই থাকব, চেটেপুটে এই পৃথিবীর আস্বাদ নেব এবং তাদের মধ্যে যাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকবে, তারা ওদের কাছ থেকে যত দ্রুত সম্ভব সেটা কিনে নেবে। সে জন্য বিভিন্ন সংস্থা আয়ু-ব্যাঙ্কও তৈরি করবে।
— সেটা আবার কখনও হয় নাকি? লোকে বুঝবে কী করে কার আয়ু কতটা?
মুচকি হেসে সময়-কণা বলল, বোকার মতো কথা বোলো না তো। আজ থেকে এক হাজার বছর আগে গায়ে হাত দিয়ে লোকে বুঝতে পারত জ্বর হয়েছে। কিন্তু কতটা জ্বর হয়েছে, সেটা কি বুঝতে পারত?
— না।
— সেটা বোঝার জন্য পরে যেমন থার্মোমিটার আবিষ্কার হয়েছিল, তেমনই, আমি যাওয়ার অনেক আগেই, লোকের আয়ু মাপার যন্ত্র আবিষ্কার হয়ে যাবে।
— সে কী গো?
— হ্যাঁ।
জুরান বলল, তা হলে একই লোক বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে দু’-চার বছর করে আয়ু কিনে-কিনে তো হাজার-হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারবে, তাই না?
সময়-কণা তার কথায় সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ, তাই-ই তো।
— কিন্তু আশি-নব্বই বছর হলেই তো মানুষ কেমন অথর্বের মতো হয়ে যায়। জরাজীর্ণ হয়ে যায়। শরীরের চামড়া কুঁচকে যায়। শরীরের কলকব্জা বিকল হতে শুরু করে। অত বছর বাঁচলে তো তার অবস্থা মরার চেয়েও খারাপ হয়ে যাবে। তাই না?
— না। একেবারেই না। জাদুঘরে যেমন মৃত জীবজন্তুদের দেহ কেমিক্যাল দিয়ে যুগের পর যুগ ধরে একেবারে অবিকৃত করে রাখা হয়, তেমনি তত দিনে বাজারে এমন লোশন বেরিয়ে যাবে, যেটা মাখলে, যে যখন মাখবে, ঠিক সেই চেহারাটাকেই সে সারা জীবন ধরে অবিকল রাখতে পারবে। সুতরাং কেউ যদি তিরিশ বছর বয়সে ওই লোশন মাখে, আয়ু কিনে কিনে পাঁচ হাজার বছর বাঁচলেও সে কিন্তু একেবারে ইনট্যাক্ট ওই তিরিশ বছর বয়সের মতোই তার ।
#storyandarticle
https://storyandarticle
#সিদ্ধার্থ_সিংহ
Post a Comment