স্মৃতির কুঠুরিতে শান্তিনিকেতন - প্রিয়াঙ্কা ঘোষ
দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে এমন কিছু ঘটনা থাকে,যাকে বিস্মৃতির কুঠুরিতে রাখা যায় না,তারা কোনো না কোনো উপায়ে স্মৃতির মণিকোঠায় আশ্রয় গ্রহন করে নেয়।আর সেই স্মৃতির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঐ ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোকে আমরা রোমন্থন করবার সুযোগ পেয়ে থাকি,এরকমই একটা ঘটনা,যা মাঝে মাঝে আমার স্মৃতির কুঠুরি থেকে উঁকি দিয়ে যায় হৃদয়ের অন্তরালে,সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত গুলোর কথাই কলমের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাবে।
বিগত কয়েকবছর আগে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিলাম,উদ্দেশ্য ছিল খোয়াই এর হাট দেখবার আর কবিগুরুর অপূর্ব সৃষ্টিকে চাক্ষুষ উপভোগ করার এক প্রবল ইচ্ছে,সবকিছুই পূর্ণ হয়েছিল।
আমরা শান্তিনিকেতন যাওয়ার আগে প্রথমে তারাপীঠ গিয়েছিলাম,সেখানে মায়ের পুজো দিয়ে শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম,ট্রেন পথেই সেখানে পৌঁছালাম,
আমরা প্রান্তিক স্টেশনে নেমেছিলাম কারণ সেখান থেকে আমাদের গন্তব্যস্থল খানিকটা নিকটবর্তী ছিল,স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে সোনাঝুরি গ্রামের দুর্গাবাড়িতে পৌঁছাই,সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল,এই ব্যবস্থার দুটো কারণ ছিল,প্রথমটি ছিল খোয়াই এর মেলা,
এই মেলাটি দুর্গাবাড়ির পাশেই অনুষ্ঠিত হয় প্রত্যেক শনিবার। আমরা সেই মেলাটিতে খুব ভালোভাবে ঘুরতে পারি আর মেলার মাধুর্য্য দেখতে দেখতে আনন্দে আত্মহারা হতে পারি তারজন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।দ্বিতীয়টি ছিল-অপরূপ সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এই দুর্গাবাড়ি।
পরিবারের কিছু সদস্য আমরা পৌঁছানোর আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলো,সেইরকম কথাই হয়েছিল যে আমরা বেলার দিকে গিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হবো,তারা সবাই ভোরেই পৌঁছাবে।আমরা ওখানে একদিনই ছিলাম,শনিবার রাত্রিবাস করে রবিবার কলকাতা ফেরা,
সেই একটা দিন যেন আমার হৃদয়ে ছবির মতো অঙ্কিত হয়ে রয়েছে,সোনাঝুরি গ্রামের সেই মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক শোভা আর দুর্গাবাড়ির মোহময় অভিজ্ঞতা সবকিছু রয়ে গিয়েছে স্মৃতির গভীরে,শান্তিনিকেতনের প্রত্যেক কোণায় যেন অদ্ভুত লাবণ্য বিরাজ করছে,চারিদিকে যেন রূপ,রস,গন্ধ,স্পর্শ মিশে আছে,সবকিছুর মধ্যে সরলতা লুকিয়ে আছে,সেখানকার মানুষ থেকে আরম্ভ করে প্রকৃতির বুকে যা কিছু রয়েছে সবই স্বাধীন।
পর্ব-২
প্রথমেই বলি প্রকৃতির কথা,এখানকার প্রকৃতিকে দেখলে মনে হয় যেন কোন এক অদৃশ্য শিল্পি তার রঙ তুলির টানে প্রকৃতিকে অনিন্দ্য সুন্দর রূপে সাজিয়েছে,আর এই প্রকৃতির ছত্রছায়ায় নির্ভাবনায় রয়েছে শান্তিনিকেতন।সেখানকার গাছগুলো যেন একে অপরের সঙ্গে খুনসুটিতে ব্যস্ত।
তারা কখন হাসছে কখন বা ঝগড়া করে অভিমানে সরে যাচ্ছে,কেও আবার প্রেমালাপে বিভোর হয়ে আছে,লালমাটির বুকে দন্ডায়মান গাছগুলো আপন খেয়ালে মেতে উঠেছে,সোনাঝুরি গাছের সঙ্গে দেবদারু গাছের শোভাও বিরাজ করছিল,মাঝে মাঝে বাতাসের দোলায় আন্দোলিত হচ্ছিল,
বাতাসে মিশে আছে শাল,মহুয়ার গন্ধ,এই গন্ধ এক অদ্ভুত মাদকতার সৃষ্টি করে আর খোয়াই-কোপাই নদী,তারা নিজের খুশি মতো প্রবাহিত হয়ে চলেছে।সেখানকার সকালের আকাশ একটু বেশিই উজ্জ্বল।সূর্যদেবের স্বর্ণালী আভায় গাছের পাতা স্বর্ণময় হয়ে ওঠে,এইরকম জায়গায় একবার গেলে আর ফিরতে মন চায় না।
পর্ব-৩
শান্তিনিকেতনের খোয়াই এর মেলা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।তাই এই মেলা সম্পর্কে কিছু না লিখলে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে,কথায় আছে শান্তির মিলনক্ষেত্র শান্তিনিকেতন।আমরা যখন ওখানে পৌঁছেছিলাম তখন চারিদিকে নিস্তব্ধতার একটা আস্তরণ ছিল।
শুধু গাছেদের বাক্যালাপই কর্ণগোচর হচ্ছিল।এরপর আস্তে আস্তে মানুষের কোলাহল শুরু হল।কারণ ঐসময় খোয়াই এর হাটের প্রস্তুতি নিতে থাকে বিক্রেতারা।আমি প্রথম পর্বেই বলেছিলাম,যে দুর্গাবাড়িতে আমরা উঠেছিলাম সেখানেই খোয়াই এর মেলা বসে।মেলাটি দিনের আলোয় প্রত্যেক শনিবার অনুষ্ঠিত হয়।
পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের শেষ রশ্মিতে মেলা যেন বেশি জমে ওঠে।শান্তিনিকেতনের পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে অনেক বিক্রেতারা নানা ধরনের হাতের কাজের জিনিস নিয়ে আসে,যেমন-কাঁথা কাজের শাড়ী,চাদর,নানাধরনের গয়না,ঘর সাজানোর শৌখিন জিনিস,কতরকমের চুড়ি,কুর্তির কাপড়,এইসব জিনিসের সঙ্গে থাকে বাউল গান,
বাউলরা দলে দলে এসে সোনাঝুরির এক একটি স্থানে বসে আপন মনে গান গেয়ে চলেছে,আর যারা এই মেলা দেখতে এসেছে তাদেরও আনন্দ দান করে চলেছে,ক্রেতারা কেও কেও জিনিস কিনতে কিনতে মুগ্ধ হয়ে বাউল গান শুনছে,কেও আবার বাউলদের সঙ্গে সঙ্গোবদ্ধ হয়ে গলা মেলাচ্ছে,তাদের গানের ছন্দে পায়ের তাল তুলছে,আমিও কেনার ফাঁকে বাউলদের গান উপভোগ করছিলাম,মাঝে মাঝে আমার পা দুটোও নেচে উঠছিল,
মেলা থেকে আমি সেরকম কিছুই কিনিনি,মেলার সৌন্দর্যে মন ভরে গিয়েছিল,বিশ্বভারতীর অনেক ছাত্র-ছাত্রীদেরও সমাগম ঘটে এই মেলা প্রাঙ্গণে,তারা কেও আসে ছবি আঁকতে,কেওবা মেলার অনিন্দ্য সুন্দর রূপমাধুর্যকে নিজেদের ক্যামেরায় বন্দী করে নিয়ে যেতে,কেও আবার ঐ মনোরম দৃশ্য গুলোর সঙ্গে মেতে ওঠে।তাছাড়াও নানা জায়গা থেকে নানান ধরনের মানুষের সমাগম হয়েছিল।তারা প্রত্যেকেই মেলা থেকে কিছু না কিছু কিনেছিল।
আমার পরিবারের সদস্যরাও কমবেশি কিনেছিল।আমি বেশি কিছু কিনিনি কারণ তখন আমি সেই প্রকৃতি এবং তার মাঝে অপূর্ব মেলার এমন মন্ত্রমুগ্ধকর সৌন্দর্যকে মনের ক্যানভাসে অঙ্কন করতে ব্যস্ত ছিলাম।তারপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল,সূর্যদেব তখন তার রক্তিম আভায় এই মেলাকে রাঙিয়ে তুলেছিল।সূর্যাস্তের পর থেকেই মেলা ভাঙতে শুরু করে।
কারণ এই মেলা কোনো বৈদ্যতিক আলোয় বসে না,দিনের আলোতেই বসে।ভাঙা মেলার শেষ মুহূর্তেও বিক্রি হতে থাকে।এরপর মেলা পুরোপুরি ভেঙে গেলে সবাই নিজের নিজের গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।তখন পাখির দলও নিজস্ব কলরবে জানান দেয় যে সন্ধ্যা নামছে এবার সবার বাসায় ফেরার সময় হয়েছে।
পাখিরা তাদের নীড়ে ফেরে এই আশা নিয়ে যে আবার আরেকটি নতুন দিন শুরু হবে,আবার তারা খোলা আকাশের বুকে এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত ভেসে বেড়াবে নির্দিধায় ডানা মেলে,,আর মেলার বিক্রেতারাও ঘরে ফেরে তাদের বিক্রি না হওয়া জিনিস গুলো নিয়ে,আর তারা অপেক্ষায় থাকে আরেকটি শনিবারের হাটের জন্যে,এই আশা নিয়ে যে তাদের বিক্রি না হওয়া জিনিসগুলো পরের শনিবারের হাটে হয়তো বিক্রি হয়ে যাবে। তবে লোকমুখে শোনা ইদানিং প্রায় প্রত্যেক দিনই হাট বসছে।
অন্তিম পর্ব
অন্তিম পর্বের শুরুতেই থাক দুর্গা বাড়ির কথা, গাছেদের তত্ত্বাবধানে বাড়িটি সসম্মানে বিরাজ করছে সোনাঝুরি গ্রামের মধ্যে, রাত নামলেই বাড়িটিকে একটি মায়াপুরী মনে হতো, আমার কাছে বাড়িটির সবথেকে আকর্ষণ এর জায়গা ছিল, একটি বেতের তৈরি ঘর, ঘরটি ছিল বাড়ির ২তলায়, ঘরটির আলাদা নিজস্ব একটা ব্যালকনি ছিল, সেখান থেকে চাঁদনী রাতের নৈসর্গিক মনোহারিতা উপলব্ধ হতো, আমার কল্পনার জগতে তখন ঘরটিকে নিয়ে নানান এলোপাথাড়ি কল্পনার আনাগোনা শুরু হয়েছিল। সেগুলো কল্পনার রাজ্যে র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাটাই শ্রেয়।
সেই মায়াবী রাত কেটে যাওয়ার পর, পরেরদিন ভোরবেলা গ্রাম দেখতে যাওয়া হয়েছিল, গ্রামের প্রতিটা বাড়িতেই শিল্পকলার অপূর্ব ছোঁয়া,সেদিন ছিল ফেরার পালা, দুপুরে পুরো বিশ্বভারতী, মিউজিয়াম সবকিছু দেখে তারপর কঙ্কালীতলা মায়ের মন্দিরে পুজো দিয়ে কলকাতায় ফিরেছিলাম, শান্তিনিকেতনে কাটানো সেই একটা দিন আমার স্মৃতির গভীরে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে, চোখ বন্ধ করলেই সেদিনের প্রতিটা মুহূর্ত কে আজও খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারি।
এরপরে আরও একবার গিয়েছিলাম কিন্তু সেদিন আর থাকা হয়নি, যেদিন গিয়েছিলাম সেদিনই ফিরেছিলাম, সেইবার গিয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখেছিলাম। যেমন- সোনাঝুরি তে অনেক হোটেল হয়েছে, শনিবারের হাট এখন রবিবারেও বসছে আর সেই দুর্গাবাড়ির একটু নবত্ব প্রাপ্তি ঘটেছে, এই মুহূর্ত গুলো এখন সব স্মৃতি কিন্তু দুর্গা বাড়ির সেই বেতের ঘরের কল্পনা গুলো যেন আজও জীবন্ত।হাত বাড়ালেই যেন তাকে স্পর্শ করতে পারবো,এই কল্পনা গুলোকে একত্রে জড়ো করে কোনো গল্প রচনা করতে পারবো।।
© ছবি : প্রিয়াঙ্কা ঘোষ
#storyandarticle
Post a Comment