বগলা ভটচাযের গল্প - ভৌতিক গাছ ও বগলা (পর্ব ৫ ) - সুব্রত মজুমদার
বামনটা শুরু করল তার কাহিনী। একটা বড় দেখে মাছের টুকরো তীরে গেঁথে আগুনে দিতে দিতে বলল, – “সে অনেকবছর আগের কথা, সমরপুরে একটা ছোট্ট মাটির বাড়িতে বাস করতাম দুজনে। আমি আর প্রভা। প্রভা আমার স্ত্রী। আমার শখ ছিল মাছ-ধরা আর প্রভার শখ বাগান করা। আমাদের ছোট্ট বাগান ওর হাতের জাদুতে ভরে থাকত নানারকম ফুল আর ফলে।
শোভা শুধুমুধু শখের বাগানই করত না, রীতিমত এক্সপেরিমেন্ট করত গাছপালা নিয়ে। মাইনর পাশ গেঁয়ো মেয়েটা ফুলের সঙ্গে ফুল মিলিয়ে তৈরি করত নতুন প্রজাতি। যে জবা গাছ প্রকৃতিগতভাবেই নিস্ফলা সেই জবার ডালে আলো করে থাকত জবার বীজকোরক। সেই বীজ হতে যে চারা গুলো জন্ম নিত সেগুলোতে থাকত বর্ণ আর পাঁপড়ির রকমের।
মাটির ভাঁড়ে করে বনসাই, সুপারির গাছে গোলমরিচের লতা, বকফুলের গাছের তলায় দার্জিলিং হতে আনা চায়ের গাছ, বাগানের এককোনে বিশালাকায় ব্রেডফ্রুট-ট্রি, – কি না ছিল সেই বাগানে। ওর কেবল একটাই অভিযোগ যে আমি গাছ ভালোবাসি না। এজন্য আমার হাতে গাছ হয়ও না।
আমার মাছ-ধরা নিয়েও ছিল ওর ঘোর আপত্তি। বলত ও কাজ নাকি কুঁড়ের কাজ। সারাদিন ফাতনার দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। আমি বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়েই বলতাম, “এই নেশার জন্যই তো মাছের ছাড়ান হয় না কোনোদিন। কতধরনের মাছ খেতে পাও বল তো।”
ও পাল্টা জবাব দিত। কিন্তু স্বভাব যায় না ম’লে। মাছধরার নেশা ত্যাগ করা বেশ কঠিন। তাই সময় পেলেই বেরিয়ে পড়ি ছিপ হাতে। শুধু এপাড়া ওপাড়া নয়, ভালো পুকুরের সন্ধান পেলে গ্রামান্তরেও চলে যাই। এমনকি দূর-দূরান্তরে যেতেও বাধে না।
সময়টা শ্রাবণের সকাল, ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে আমানির মতো মেঘ। ভোরবেলাতেই বেরিয়েছিলাম মাছ ধরতে। একটা দু’সের ওজনের কালবাউস পেয়েছি। বেশ সন্তর্পনে মাছখানা ঝোলায় ভরে ছিপ গুটিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরলাম।
পথেই দেখা হয়ে গেল শ্রী দাম মাষ্টারের সঙ্গে। শ্রীদাম চট্টরাজ পাশের গ্রামের হাইস্কুলের ভূগোলের শিক্ষক। বাড়ি বাঁকুড়ার কোনও এক গ্রামে। তা দু’চারকথা হতে হতেই মাছধরার প্রসঙ্গ এল।
শ্রীদামমাষ্টার বললেন, “সে পুকুর একখান আছে বটে আমাদের ওদিকে। জলেমাছে পরিপূর্ণ হে। কিন্তু ধরবার শক্তি নাই। যে উখানে যাবেক তার বঁড়শিপত্তর খেয়ে হজম করে দিবে ওই মাছ। আপনাদের কর্ম লয়।”
জেদ চেপে গেল। কি বটেক আর কি নাই বটেক আমাকে দেখতে হবে। মাষ্টারের কাছে ঠিকানা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। পরদিনই বেরিয়ে পড়লাম সেই পুকুরের সন্ধানে। বৌ নিষেধ করেছিল, কিন্তু পারে নাই। আমাকে আটকানোর ক্ষমতা ওর ছিল না।
সঙ্গে চলল আমার এক বন্ধু মহীতোষ। মহীতোষও আমার মতোই বাউন্ডুলে। জুটিটা ভালোই জমল। পদব্রজেই বেরিয়ে পড়লাম । পথে তেমন সমস্যা হল না। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছেই দেখলাম শ্রীদাম মাষ্টারের কথায় এতটুকুও মিথ্যে নেই। বিশাল পুকুরটা দেখেই অবাক লাগে।
পুকুরটার পাড়ময় একধরনের খুব সুন্দর দেখতে গাছ। সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটেছে সেই গাছ হতে। কি সুন্দর সুমিষ্ট তাদের গন্ধ। মন আনচান করে। মহীতোষকে বললাম, “আমি ছিপটিপ ঠিক করি, তুমি তা করতে এই গাছের একটা চারা জোগাড় কর তো। ঘর নিয়ে যাব।”
মহীতোষ লেগে গেল নিজের কাজে। আমি সঙ্গে আনা চারগুলো (বিভিন্ন জিনিস মিশিয়ে তৈরি মাছের সুগন্ধিত খাবার ) ঘাটের কাছে ছড়িয়ে দিলাম, যাতে মাছেরা আকৃষ্ট হয়। আমার তৈরি চার মাছেদের কাছে অমৃত, এর লোভে মাছ আসবেই।
অনেক মেহনত করে তৈরি করি এই চার। একটা শুকনো খোলায় সর্ষের খইল ভেজে তাতে ভেজে রাখা একাঙ্গী, বচ, লেবুর পাতা ইত্যাদি মিশিয়ে গুঁড়ো করি। তারপর এই গুঁড়োর সঙ্গে পরিমাণ মতো ভাত মিশিয়ে তৈরি হয় এই চার। তবে ভাতের অভাবে শুধু গুঁড়োটাই ছড়িয়েছি। এতেই অনেক।
মাছের চার হিসেবে টোপ হিসেবে অনেকেই অনেককিছুই ব্যবহার করেন। যেমন পচুই মদ তৈরির পর যে পচা ভাতটা পড়ে থাকে তাকে বলে খাড়া। এই খাড়া মাছের খুব প্রিয়। আবার পিঁপড়ের ডিমও মাছের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মাছের টোপ বা চার হিসেবে হিং বা একজাতীয় কিছুর ব্যবহার করা অনুচিত। এতে মাছ অন্ধ হয়ে যায়। আর এই পাপ ক্ষমাহীন।
ঘাটের জলে চার ছিটিয়ে বঁড়শিতে টোপ গেঁথে আমি তৈরি। মহীতোষও চলে এসেছে। ওর হাতে সেই বিশেষ গাছের দুটো চারা। চারাদুটো নামিয়ে রেখে ছিপ নিয়ে বসল আমার পাশেই। সত্যি বলতে কি দীঘিটাতে মাছ প্রচুর আর এক একটা বিরাট বিরাট। কিন্তু ধারেকাছে আসে না। আর এলেও আমার ছিপে উঠবে বলে বোধহয় না। এতবড় মাছ ধরতে স্পেশাল ছিপের দরকার।
সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতে লাগল না কিছুই। যে নেশায় এতদূর এসেছি যদি কিছুই হাতে না আসে তাহলে তো সম্মান থাকে না। হে ভগবান তুমি আমাদের সম্মান রক্ষা কর।
ভগবান আমার প্রার্থনা শুনলেন। আমার ছিপেই উঠল একটা বিরাট জিওলমাছ। দুজনে মিলে অনেক কষ্টে ব্যাটাকে ডাঙ্গায় তুললাম। ঠিক হল সামনে যে গ্রাম পাব সেখানেই এটার রান্না হবে। স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মাঝের বড় কাঁটাখানা নিয়ে যাব।
কিন্তু এতবড় মাছ বয়ে নিয়ে যাওয়াও কষ্টকর। রাতের অন্ধকারে মাছটাকে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর হাঁটি আর মনে মনে প্রার্থনা করি যেন একখানা গাঁয়ের দেখা পাই। আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা সফল হল। একটু এগোতেই একটা গ্রাম পেলাম। কিন্তু গ্রামের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম না। গ্রামের বাইরে বসে থাকা কতগুলো সাধু আমাদের কাছ হতে মাছটা নিয়ে আগুনে ঝলসাতে লাগল।
পেটপুরে মাছ খেলাম। আমার অনুরোধক্রমেই মাছের মাঝের কাঁটাটা আস্ত রেখে দিল। পরদিন সকাল হতেই মাছের কাঁটাখানা আর গাছের চারাদুটো নিয়ে রওনা দিলাম। ঘরে পৌঁছেই সেই কাঁটাখানা দেখালাম সবাইকে। সবার মুখেই আমার প্রশংসা। বর্শেল বটে একটা।
গাছের চারাদুটোর একটা পুঁতে দিলাম প্রভার শখের বাগানে আর একটা আমাদের মাঠ আগলানোর কুঁড়ের পাশে। দিন দিন বাড়তে থাকল সে গাছ। আর তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকল ভৌতিক কান্ডকারখানা । রাতের বেলায় মাছের কাঁটাখানা নাকি হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। গাছটার ডালে চড়ে খেলা করে। পাড়াপ্রতিবেশীর বাড়িতেও যায় ভয় দেখাতে। সবেমিলে শোচনীয় অবস্থা।
পাড়ার সবাই এসে ধমকি দিয়ে গেল। চণ্ডিমণ্ডপে বিচার বসল। আমি তো বলেই দিলাম যে এসবের বিন্দুবিসর্গও আমি জানি না, দরকার হলে মাছের কাঁটাখানা কোথাও ফেলে দিয়ে আসব। গ্রামের লোক আমার প্রস্তাবে সম্মত হলেন। কাঁটাখানা পুঁতে দিয়ে এলাম মাঠ আগলানো কুঁড়ের পাশে সেই গাছটার নীচে ।
মাছের কাঁটাখানা পুঁতে দেওয়ার পর হতেই জায়গাটা মরুভূমিতে পরিণত হতে লাগল।
আর ওই গাছটা আস্তে আস্তে শুকিয়ে ঝরে ঝরে পড়তে লাগল। গাছের সেই শুকনো টুকরোগুলো হতে জন্ম নিতে লাগল ফণিমনসার গাছ। দেখেশুনে আঁতকে উঠল সবাই। জায়গাটার ধারেকাছে যেতেও ভয় পেতে লাগল।
এসবের পরেও আতঙ্কের অবসান হল না। ঘরের বাগানে লাগানো গাছটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে লাগল। প্রভাও কেমন যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। ও আর বাগানে যায় না, গাছ দেখলে আঁতকে ওঠে। অথচ আমি কিছু জিজ্ঞাসা করলেই চুপ করে থাকে। কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না।
কিন্তু আমার জেদের কাছে হার মানতে হল ওকে। ছলছল চোখে বলল, “এ কথা বলার পর তোমার আর আমার কি হবে আমি জানি না, কিন্তু মাথার দিব্যি যখন দিয়েছ তখন বলতেই হবে। তবে শোন-
চলবে…..
#storyandarticle
Post a Comment