দেবব্রত রায় - হৃদয়গঞ্জের হাট
পর্ব – ১
সেবার কোনো নামিদামি জায়গায় বেড়াতে যাব না ভেবেই হিমালয়পর্বতমালার দেশ নেপাল আর, বিহারের ঠিক মাঝামাঝি একটা অখ্যাত গ্রামে গিয়ে উঠলাম। বিভূঁই জায়গায় ভরসা বলতে বন্ধু রবিউলের নানাসাহেবের একখানা টালি-ইঁটের তৈরি পুরানো কোঠাবাড়ি। সেটাকে আশ্রয় করেই কয়েকদিনের জন্য সস্ত্রীক ডেরা নিলাম।
সঙ্গে বৃদ্ধ চাকর কাম গার্জেন রামদীন।
শহুরে চোখে গ্রামটাকে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই সাধারণ মনে হলেও, রবিউলের নানাসাহবের কোঠাবাড়িটা কিন্তু প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লেগে গেল। এখানে পৌঁছানো ইস্তক সমস্ত বাড়িটা-ই ঘুরে ঘুরে দেখে নিচ্ছিলাম। টুকরো টুকরো রঙিন কাঁচের জাফরি দিয়ে ঘেরা প্রসস্ত বারান্দাসহ অপূর্ব নক্সা-সমৃদ্ধ খিলান দিয়ে তৈরি ভেতর- বাড়িটা যেন এই অজ পাড়াগাঁয়ে পৃথক একটা দ্বীপভূমির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
লক্ষ্য করলাম, বাড়িটার ঠিক সদর দরজার পাশেই রয়েছে লাল ইঁটের তৈরি একখানা পাতকুয়ো। পাতকুয়োটা সম্বন্ধে রবিউল বলেছিল, এ গাঁয়ের সবাই এই পাতকুয়োর জল খেয়েই তৃষ্ণা মেটায়। রোগ-জ্বালা হলে গাঁয়ের লোকজন হাকিম- বদ্যি-র কাছে যায় না। মনে মনে মানত করে কুয়োর জল খেলেই নাকি, তাদের সব ব্যাধি সেরে যায়। কুয়োটাকে আসপাশে-র সমস্ত গ্রামের মানুষজন-ই পীরবাবার কুয়ো বলে মান্যি করে, পুজো-আচ্চা দেয়। প্রতি শুক্কুরবার শুক্কুর -বার সিন্নি চড়ায়।
আমি কুয়োটার ভিতর উঁকি মেরে দেখলাম , কাকচক্ষু-জল ভিতরে টলটল করছে।
পর্ব – ২
জোরে গাড়ি চালিয়ে আসায় একটু সকাল-সকাল-ই রবিউলদের গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হাতে প্রচুর সময় থাকায় ভাবলাম, কাছেপিঠে নিশ্চয়-ই বাজার-হাট আছে , খোঁজখবর নিয়ে যাই একবার ঘুরে আসি। যদিও, মনে মনে ঘুরে আসার কথা ভাবলাম বটে কিন্তু, যাবো কীসে, এই চিন্তা মাথায় নিয়ে-ই বাড়িটার এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে দেখতে হটাৎ-ই নজরে পড়লো পিছনের রসুইঘরের বারান্দায় একখানা পুরানো আমলের বাইসাইকেল ঠেসানো আছে !
সাইকেলটা হাতের সামনে পেতেই, খিলান দিয়ে সাজানো সেই ভারি ভারি থামগুলোর আড়াল থেকে যেন একটা ছোট্ট ছেলে খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো ! আমি মনে মনে ভাবলাম, জীবনে এই প্রথমবার একটা জিনিস অন্তত, সময় মতো নিজের হাতের কাছে পাওয়া গেল !
সাইকেলটা ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখলাম। প্রায় সব-ই ঠিক আছে শুধু, পিছনের চাকাটায় একটুও হাওয়া নেই। স্ত্রীকে রামদীনের জিম্মায় রেখে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম, নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও সাইকেল সারানোর দোকান থাকবে। প্রয়োজন হলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেবো, এই ভেবে রাস্তায় বেরিয়ে একটু এগোতেই একজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল !
লোকটাকে আমার সমস্যার কথা বলতেই, সে তার সাইকেল থেকে নেমে এসে খুব মনোযোগ দিয়ে আমার সাইকেলটা দেখলো তারপর, ঠিক শিশুর মতো-ই, তার একমুখ হলদেটে দাঁতে-র হাসি ছড়িয়ে সে বললো,” ইকটুক দূর আছে বটে ! “এতদূর জায়গায় এসেও যে একজন দেহাতি মানুষের মুখে নিজের মাতৃভাষা শুনতে পাব এ-যেন ভাবতে-ই পারিনি! মনে মনে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলাম। ভাবলাম, যাইহোক, একজন দেশোয়ালি মানুষকে অন্তত, প্রয়োজনে কাছেপিঠে পাওয়া যাবে! আমি কিছু বলার আগে সেই লোকটাই যেন আমার মনের কথাগুলো বুঝে ফেললো।
বললো, ” এঁজ্ঞে, ইখেনে পেরায় সকলেই আমরা বাংলাদ্যাশের মানুষ। আমাদের দাদা-পরদাদারা বাঁকড়ো, ফুরুল্যা, মেদিনীফুর থিক্যা গাই-গরুর খাটাল লিয়ে ইখেনে এসে ডেরা বেঁধেছিল!
লোকটার কথা বলার ধরনটি আমার বেশ ভালো লাগলো। আমিও হেসে বললাম, “তাই !”
পর্ব – ৩
পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা একবার কথা বলতে শুরু করলে আর যেন থামতে চায়না, একনাগাড়ে বকেই চলে।লক্ষ্য করলাম, এই দেহাতি মানুষটিও যেন অনেকটাই সেই ধরনের বক্তিয়ারবাজ!আমিও যেন লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার সমস্যার কথাটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু, কোথার থেকে একঝলক ঠান্ডা- শিরশিরে বাতাস আমার গায়ে এসে লাগতেই, এই অজানা-অচেনা জায়গায় বাড়ি ফেরার চিন্তাটা আমার মাথার ভিতরে হটাৎ-ই যেন নড়েচড়ে উঠলো ! আমি সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে তাকে বললাম, “….কিন্তু, এটার কী হবে?” আমার কথা শুনে লোকটা এবার একটু থামলো তারপর, আগের মতোই তার সেই হলদেটে দাঁতগুলো বের করে হাসিহাসি মুখেই বললো, ” সাইকিল সারানোর দুকানট ইকটুক দূর আছে বটে !
তা আপুনি অই পুবপানে তাকিয়ে দাঁড়ান কেনে, উই পথ-ই সজা আপনেকে সাইকিল সারানোর দুকানটতে পৌঁছি দিবেক! ” তারপর,সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠলো ,….তব্যা, সিখেনে যাবার সময় পুটুলিতে করে ইকটুক লবণ লিয়ে যাবেন। দু-চারটা কড়ি অদবা, কয়েকটা জালখাটি যদি পেতেন…. ”
লোকটার এই অদ্ভুতধরণের কথাবার্তা শুনে আমার কেমন যেন ওকে একটু ছিটিয়াল বলেই মনে হলো । আমি হতভম্ব হয়ে রাস্তার এদিকও -দিক তাকাতে লাগলাম। আসেপাশে যদি কাউকে পেয়ে যাই এই আশা নিয়ে কিন্তু ,এদিকওদিক তাকাতে গিয়ে-ই আমার নজরে পড়লো একটু তফাতে রাস্তার ধারেই একটা মাছধরা জাল শুকোতে দেওয়া আছে।
মনের ভিতরে সামান্য দ্বিধা নিয়েও আমি তাকে বললাম, ওই তো জাল, কিন্তু ,….. আমার কথা শুনে লোকটাও পিছন ফিরে জালটা দেখল তারপর, বললো, ” আসেন, আমার সাথে আসেন! ” কথা-গুলো বলেই, সে এগিয়ে গেল তারপর, একটা চালাঘরের উঠোনের সামনে দাঁড়িয়ে কার উদ্দেশ্যে যেন হাঁক পেড়ে বললো, ” কাকি, লোতন বাবুর লেগে চারটা জালখাটি লিচ্চি-গ! ” ভিতর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর আসার আগেই সে উবু হয়ে বসে কপালে হাত ঠেকিয়ে জালটাকে প্রণাম করলো তারপর, গুনে গুনে চারটে জালকাঠি নিয়ে একটা নেকড়ার পুঁটলিতে বেঁধে দু-চার বার আমার গায়ে-মাথায় বুলিয়ে কোনোরকম ইতস্তত বোধ না করেই লোকটা নিজের হাতে সেগুলো আমার পকেটে পুরে দিয়ে বললো, ” যান, সজা উই পথ ধরে এগালে-ই ভুলভুলুনির হাট।
সিখেনে জড়া শিমুলগাছের তলায় আপনের সাইকিল সারানর মানুষট বুসে আছেন বট্যা ! ”
ভুলভুলুনির হাট! ভাবলাম, বেশ নাম তো হাটটার! লোকটাকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে একরাশ কৌতুহল নিয়েই আমি হাঁটা দিলাম ভুলভুলুনির হাটের দিকে।
পর্ব – ৪
বাদামিরঙের পাথর বিছানো রাস্তার দুপাশে যতদুর চোখ যায় শুধুই কার্পেটের মতো ঢেউ খেলানো সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ আর, সেই বিশালাকৃতির তৃণভূমি জুড়ে প্রায় দশ- পনেরো হাত ছাড়াছাড়া-ই তমাল পাইন পিয়াশাল জুনিপার হেমলক বির্চ গাছগুলি যেন পথিকের শ্রান্তি নিরাময়ের আঁকুতি নিয়ে একেকটি ছত্রালয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ! বিকালের প্রারম্ভিক আলোয় রাস্তার থেকেই বিস্তীর্ণ সেই সবুজ ভূমির একেবারে শেষপ্রান্তে ঘন জঙ্গলের কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তরেখার সামনে দাঁড়িয়ে হটাৎ-ই নিজেকে যেন বড়ো-ই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হলো আমার !
আমি সেই বিশাল দিগন্তরেখাটির দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে-ই আবারও সাইকেলটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশে বনসাইয়ের মতো গজিয়ে ওঠা বির্চ-ঝোপগুলোর আসেপাশে লক্ষ্য করলাম, লাল হলুদ রঙের নরম পালকে মোড়া একপাল গোল গুবগুবে মুরগী ছড়িয়েছিটিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। দেখামাত্র-ই, ওদেরকে যেন ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে হলো !
আমি সেই গাঢ় সবুজ রঙের ছোটোছোটো বির্চ ঝোপ -গুলোর আসেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অদ্ভুত আকৃতির মুরগীগুলোর দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই লক্ষ্য করলাম, আমার চারদিক ঘিরে যেন অপূর্ব এক রঙের খেলা শুরু হয়ে গেছে! নরম রোদ্রুতে ভেসে যাওয়া আদিগন্ত সবুজ মাঠ, গাছ-গাছালি সবই যেন সেই রঙের খেলায় মেতে ধীরেধীরে আসন্ন গোধুলি বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে !
আমি সেই রঙ-বে-রঙের খেলা দেখতে দেখতে হটাৎ-ই যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করে ভীষণ আশ্চর্য হয়েগেলাম ! লক্ষ্য করলাম ,পাম্পহীন সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে এতখানি পাহাড়ি-পথ বয়ে নিয়ে আসা সত্ত্বেও আমার যেন সামান্য ক্লান্তিটুকুও অনুভব হচ্ছে না ! আমি যেন সম্পূর্ণ অতীতহীন হয়ে হিলিয়ামগ্যাস ভর্তি একটা বেলুনের মতো হাওয়ার স্রোতে ভাসতে ভাসতে বাধাহীন এগিয়ে চলেছি ! আমার জীবনে যেন পুরানো কোনো যন্ত্রণা নেই, কোনো আঘাত নেই, তার বদলে একটা পক্ষীরাজঘোড়া যেন আমার বুকের ভিতরে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেরাচ্ছে !
পর্ব – ৫
পাহাড়ি পথ ধরে কিছুটা এগোনোর পর একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষের কলরোল শুনতে পেলাম। আরেকটু এগোতেই দেখলাম, একদল নারী পুরুষ নিজেদের মধ্যে রঙ্গ-রসিকতা, গান-গল্প করতে করতে হাট ফিরতি পথ ধরে যে-যার বাড়ি ফিরে যাচ্ছে ।
ভীড়টা আরও কাছাকাছি আসতেই খেয়াল করলাম, দলের পুরুষগুলি যেন খেলার ছলে কখনো মাঠে—গাছের নীচে কখনোবা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আসঙ্গলিপ্সায় তারা নিজের নিজের নারীকে ইশারায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে আর, মেয়েগুলিও এক অদ্ভুত নাচের ভঙ্গিমায় নিজের পুরুষসঙ্গীটিকে ছোঁয়ার নেশায় মেতে কখনো রা -স্তার থেকে মাঠে, মাঠের থেকে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে আর, অদ্ভুত মজার সুরে গান গায়তে গায়তে, হাসতে হাসতে নিজেদের শরীরময় এক অপূর্ব হিল্লোল তুলে একজন আরেকজনের গায়ের উপর ঢলে ঢলে পড়ছে ! দেখলাম, অনেকে আবার আমার মতো-ই , ভুলভুলুনির হাটের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে।
সেই ভীড়ের ভিতর হটাৎ-ই,একটা কম বয়েসী ছেলে আমার পাশে এসে ঝুপ করে তার সাইকেল থেকে নেমে পড়লো তারপর, আমার দিকে তাকিয়ে হাসিহাসি মুখে বললো , ” নতুন বাবু বুঝি ভুলভুলুনির হাটে যাবেন? ”
ছেলেটি এমনভাবে তার সাইকেল থেকে নেমে এলো মনে হলো যেন ডানায় ভর করে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে সে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তার দিকে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়লাম। বললাম, ” হ্যাঁ।
” তারপর, সাইকেলটা দেখিয়ে বললাম, ” এই যে এটা সারাতে হবে। ” ছেলেটি আমার সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বললো, ” ওঃ, তাহলে তো আপনাকে নন্দাইমিস্তিরির কাছে যেতে হবে। হাটের পশ্চিমে জোড়া শিমুলগাছের তলায় ওর মন্ডি ।…. তবে, আপনাকে কিন্তু ধৈর্য ধরে বসতে হবে। আজ ওর অনেক কাজ ।
” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ” সবাই বুঝি ওর কাছেই সাইকেল সারায়? ” ছেলেটি বললো, ” হ্যাঁ, তা তো সারায়! তাছাড়া, নন্দাই মিস্তিরির কী শুধু একটা কাজ! ও নতুন জুতো তৈরি করে, ছেড়া জুতোয় তাপ্পি মারে, ছেলেদের খেলার বল, ছাতা, সাইকেলের টায়ার সেলাই করে। হাঁড়ি কড়াই বালতি জলের গামলা ফুটো হয়ে গেলে সারিয়ে দেয়, বাটনা গাছের কাঠ দিয়ে দাঁ, করাত খুকরি-র হাতল বানিয়ে দেয় ।
” আমি বললাম, ” ও বাবা, তাহলে তো ওর অনেক কাজ ! ” ছেলেটি বললো, ” আরও আছে! ঢেকি-ছাটা চাল, নতুন ধানের খৈ, চিড়া,জ্বালানিকাঠ, মাটিরতেল, খড়, কঁচি বাঁশ সব পাওয়া যায় নন্দাই মিস্তিরির মন্ডিতে ! ” তারপর, একটু থেমে ছেলেটি বললো , ” চলুন , আমিই আপনাকে ওর কাছে পৌঁছে দিই। ” বলে-ই , সে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলো। আরও কিছুটা পথ এগোবার পর ছেলেটি আঙুল তুলে দূরে দেখিয়ে বললো, ” নতুন বাবু , ওই দেখুন ভুলভুলুনির হাট ! ”
পর্ব – ৬
আমি দূর থেকে ভুলভুলুনিরহাট দেখলাম ! হাট তো নয়, যেন একটা মেলা বসেছে ! দূরবর্তী সেই রাস্তার থেকেই আমার মনে হলো, সেই মেলার ভিড়ে কেউ-ই হাঁটছে না, সকলেই যেন নাচের ভঙ্গিতে এক জায়গার থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করছে! ছেলেটির সাথে পায়ে পায়ে আমি ভুলভুলুনির হাটে গিয়ে ঢুকলাম। হাটের ভিতরে পা রাখতেই মনে হলো , আমি যেন একটা সবপেয়েছির দেশে এসে ঢুকে পড়লাম! কী নেই সেখানে! দেখলাম, হাটের প্রায় মধ্যিখানে বসেছে মনোহারি দোকান!
মেয়েদের বেলোয়ারি চুড়ি, রেশ্মিফিতে, মাথার ঝুমকো কাটা, গিরিমাটি , আলতা পাতা,ছোট ছোট শিশিতে মোম আর , ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি মেয়েদের ঠোঁট রাঙা -নোর মলম , পুঁতির মালা, কাজললতা, রুজ, পমপমের দোকান ঘিরে খুব ভিড় জমে উঠেছে । একটু দূরেই একটা মহুল গাছের নীচে বসেছে নাগরদোলা। সেখানে ছেলেমেয়েরা সব রঙগ-রসিকতায় মেতেছে। আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে সামনের পথ ধরে এগোলাম। লক্ষ্য করলাম, সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে আমার যেন কোনও অসুবিধেই হচ্ছেনা।
সকলের জন্যে-ই যেন ভিন্ন ভিন্ন পথ আগের থেকেই নির্দিষ্ট করা আছে ! বুঝতে পারলাম, প্রত্যেকেই যে-যার নির্দিষ্ট পথ ধরে যাতায়াত করছে বলেই, সকলের হাঁটার মধ্যে যেন নাচের মতো-ই একটা ছন্দ তৈরি হচ্ছে। ছে -লেটি এবার আঙুল তুলে বললো, ” নতুন বাবু, ওই যে জোড়া শিমুলগাছ। ওইখানেই নন্দাইমিস্তিরির মন্ডি।
আমাকে জোড়া শিমুলগাছ দেখিয়ে দিয়ে ছেলেটি বললো, ” এবার আমি যাই, মায়ের জন্য কাপড়ে ফুল তোলার রঙিন সুতো কিনতে হবে। ” আমি তাকে ধন্যবাদ জানাবার আগেই সে হাঁটা দিল। আমি জোড়া শিমুলগাছ লক্ষ্য করে এগোলাম।
দেখলাম , হরেক কিসিমের পসরা সাজিয়ে হাটুরেরা হাটের বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় সব দলবেঁধে বসেছে। বড়ো -বড়ো তাবু খাটিয়ে নেপালি ব্যপারিরা রঙবেরঙের পাথর, তাবিজ, মাদুলি, পাহাড়-প্রমাণ রুদ্রাক্ষ ঢেলে বিক্রি করছে ।
কেউ কেউ আবার তাদের কাঁধের ঝোলাতে করে হিং, কেশর, জাফরান, পাহাড়ি গাছের শেকড়-বাকড় ঘুরে ঘুরে দেদার বিক্রি করছে। হাটের একধার জুড়ে বসেছে সারি সারি ফলের দোকান। সেখানে থরে থরে সাজানো আছে কাঁদি ভর্তি ডাব, কলা, খোসা ছাড়ানো নারকেল, আখরোট, কিসমিস, পেল্লায় পেল্লায় আঁখ, রাঙাআলু, আম, পেয়ারা, ঝুড়ি ভর্তি দারিম্ব । লক্ষ্য করলাম, হাট ফিরতি মানুষজন কেউ কেউ সেইসব ফলপাকড় কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরছে ।
কেউ কেউ আবার, ঘাড়ে-গদ্দানে মালপত্র নিয়েই খালায় করে কাটা ফলপাকড় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে-ই খুব মজা করে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাচ্ছে আর, দোকানিরা তাদের মাছের আঁশের মতো পাতলা রূপালি ছুরি দিয়ে ফলপাকড় কেটে শালপাতার খালায় করে খদ্দেরদের হাতে হাসিমুখে সেসব ধরিয়ে দিচ্ছে।
হাটের প্রায় মাঝখান দিয়ে ঠিক ছবির মতো-ই একচিলতে সরু একটা পাথুরে খাল বয়ে গেছে । ছোট ছোট কঠের পুল দিয়ে খালটা-র এপার ওপার করা যায়। এ-রকমই একটা পুল দিয়ে সেই খালটা পেরিয়ে আমি ভুলভুলুনির হাটের আরেক প্রান্তে এসে পৌঁছালাম। পুলের উপর দিয়ে আস -বার সময় মনে হলো কেউ যেন সেই খালের জলে বরফকুচি মিশিয়ে দিয়েছে।একটু ক্ষণের জন্য খালের সেই ঠাণ্ডা হাওয়াতে আমার শরীরে যেন কাঁপুনি ধরে গেল। আমি খালের ওপারে পৌঁছে দেখলাম, কয়েকটা চালাঘরের উঠোনে মাটির ভাঁড়ে করে বিক্রি হচ্ছে মহুল থেকে তৈরি টাটকা মদ। সেখানে নারী পুরুষের ভীড় যেন একেবারে উপচে পড়ছে।
আমি সেই চিৎকার , হৈ-হুল্লোড় পেরিয়ে খানিকটা এগোতে-ই, লক্ষ্য করলাম,একটু দূরে হাটের একটা বেশ বড়ো জায়গা জুড়ে মাছধরা জাল, মাটির তৈরি গৃহ -সজ্জা , রান্নার নক্সাকরা তৈজসপত্র, ঝলমলে রঙিন শাড়ি, ড্রাগনের পেল্লায় পেল্লায় ছবি আঁকা স্কার্ফ , রুমাল, ছাতা, রাঙাপেড়ে ধুতি, ময়ূর -কণ্ঠী চাদরের পসরা ঘিরে বেশ ভীড় জমে উঠেছে ।
পর্ব – ৭
আমি ধীরে ধীরে জোড়া শিমুলগাছের নীচে নন্দাই মিস্তিরির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।মাথা নীচু করে নন্দাই মিস্তিরি একমনে কাজ করে যাচ্ছে। শরীরের গড়ন দেখে তার বয়স আন্দাজ করা মুসকিল । লক্ষ্য করলাম, হাতের কাজ সারা হলেই, নন্দাই মিস্তিরি সেগুলোকে পরপর সাজিয়ে রাখছে আর,খদ্দের এলেই সেই সমস্ত জিনিসপত্রগুলো যথানিয়মে খদ্দেরদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে তারপর, পাশের নক্সাকরা বাক্সের ঢাকনাটা খুটুস করে খুলে পাওনা -গণ্ডাগুলো গুনেগেঁথে ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখছে ।
খানিক দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলাম, বেশ কয়েকটা সাইকেল একটা বাঁশের খুঁটিতে পর পর ঠেসানো আছে। আমিও আমার সাইকেলটা সেখানে রাখতে যেতে-ই নন্দাই মিস্তিরি বলে উঠলো , ” উঁহু , উখেনে লয়, হাতে লিয়ে রাখুন, আমি ডেকে লিব! ” দেখলাম , আসেপাশে বেশ কয়েকজন লোক আমার মতোই সাইকেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে বকবক করে একনাগাড়ে গাল -গল্প করছে। একটি লোককে দেখলাম, সেই ভীড়ের থেকে একটু দূরে সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঠেস দিয়ে বসে নিজের মনে-ই বাঁশিতে এক অদ্ভুত সুর তুলে চলেছে ! নন্দাই মিস্তিরির হাতের কাজটা সারা হতেই ,একটু গলা তুলে ” ও লোটন! ” বলে কাকে যেন হাঁক পারলো । দেখলাম, শাড়িমন্ডির ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে একটা লোক ” যাইগো নন্দাই দাদা ! ” বলে যথারীতি এগিয়ে এলো ।
লোকটা এগিয়ে আসতেই, নন্দাই মিস্তিরি উঠে গিয়ে কুরির পরিস্কার জলে হাত ধুয়ে এসে শুকনো গামছায় ভালো করে মুছে নিল তারপর , পাশের দাওয়ায় গিয়ে পেতলের পাইয়ে করে মেপে মেপে লোক -টাকে চাল দিয়ে এসে আবারও আগের জায়গায় এসে বসে পড়লো। মাঝখানে শুধু একটা শব্দ কানে ভেসে এলো , খুটুস ! দেখলাম,নোটন নামের লোকটা চালের পুঁটলিখানা ভালো করে বেঁধে নিয়ে কাঁধে ফেলে হনহন করে গাছের সারির ভিতর দিয়ে হাঁটা দিল।
কতক্ষন হবে কে জানে , আমি বোধহয় ,শিমুল গাছের তলায় বসে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। হটাৎ , নন্দাই মিস্তিরি-র গলার আওয়াজ আমার কানে এল , ” আসুন গো লোতোন বাবু ।
” আমি একটা হাই তুলে উঠে দাঁড়ালাম। সাইকেলটা নন্দাই মিস্তিরি-র হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফিরে এসে আবার শিমুলগাছের তলায় বসলাম। দেখলাম , নন্দাই মিস্তিরি ততক্ষণে তার দোকানে একটা কুপি লণ্ঠন জ্বালিয়ে নিয়েছে। কখন যে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে আমার খেয়াল-ই হয়নি ।
ঘোর লাগা চোখে আমি সেই বিশাল হাটটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম , ঘন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে চারদিকে যেন হাজার হাজার জোনাকি একসাথে জ্বলে উঠেছে ! হাট তখন প্রায় ফাঁকা । নন্দাই মিস্তিরি হাতের কাজ সারতে সারতে-ই বললো , ” লোতোন বাবু, দুকানের ভিতরে এসে বইস্যান । বাইরে হিম পড়ছে , ঠান্ডা লেগে যাব্যাক । ” আমি দোকানের চালার তলায় ঢুকতে ঢুকতে বললাম , ” এই আলোয় পাংচার সারাতে পারবেন , দেখতে পাচ্ছেন তো ? ” নন্দাই মিস্তিরি বললো , ” ইতো দেখার জিনিস লয় বাবু , ই হলো অনুভব্যার কাজ । ” তারপর , মৃদু হেসে বললো ,” শত আঁধারেও ব্যাতের গরাস কী কখনো নাকের খোঁদলে ঢুকে যায় ! ”
পর্ব – ৮
এ কথা-র কোনো উওর হয় না। আমি চুপচাপ বসে নন্দাই মিস্তিরি-র কাজ দেখতে লাগলাম। কুপি লণ্ঠনের দোঁয়াসা আলোয় নন্দাই মিস্তিরি আর , সেই প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে আসা বিশাল হাটটাকে যেন কোনও এক মায়ার জগৎ বলে মনে হলো আমার! আমি ভুলভুলুনির অপার্থিব সেই রূপ দেখতে দেখতে বোধহয় , আবারও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। নন্দাই মিস্তিরি-র গলার আওয়াজে আমার চটকা ভাঙল। কখন যে তার হাতের কাজ সারা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” লেনগো লোতন বাবু, আপনের সাইকিলঠাকুর সুস্থ হইয়ে গিছেন।
” নন্দাইমিস্তিরি-র মুখে সাইকিলঠাকুর কথাটা শুনে আমি মনে মনে হাসলাম। বললাম, ” কত দিতে হবে? ” নন্দাইমিস্তিরি তার হাত-পা ধুয়ে এসে গামছায় মুছতে মুছতে বললো , ” এক পুটুলি লবণ। ” আমি আমতাআমতা করে বললাম , ” আমার কাছে নুন মানে , লবণ তো নেই তবে , জালকাঠি আছে ! ” নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” তবে , তাই দেন। ” আমি পকেটের থেকে পুটলিটা বের করে সেখান থেকে একটা জালকাঠি তার হাতে দিলাম ।
নন্দাইমিস্তিরি জালকাঠিটা আমার হাত থেকে নিয়ে তার সেই নক্সা করা বাক্সের মধ্যে রেখে ” আসছি , ইকটুক দাঁড়ান ! ” বলে সে তার দোকান ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা চোঙামুখো কাঁচ-লণ্ঠন হাতে করে নিয়ে এসে তাতে কেরোসিনতেল ভরে আমার সাইকেলের সামনে বেঁধে দিতে দিতে নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” আপনি লোতোন মানুষ, এই চাঁদনে-আলোয় পথ চিনে যেতে আপনার ভুল হয়ে যাবেক।
তাই , ….” তারপর ,লণ্ঠনটায় আলো জ্বেলে দেবার মুহূর্তে হটাৎ-ই কী-যেন মনে পড়ে যাওয়াতে সে আফসোসের সুরে বলে উঠলো , ” বাবু , আপনি তো অনেক্ষণ এয়েচেন , আপনার খিদা পায়নাই ? ” নন্দাই মিস্তিরি খিদের কথা জিজ্ঞাসা করতেই , আমার পেটের ভিতরে যেন পৃথিবীর সমস্ত খিদে একসাথে নড়েচড়ে উঠলো। আমি বললাম , ” হ্যাঁ , মানে, তা পেয়েছে ! ” নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” তালে , ইকটুক বস্যান! ” কিছুক্ষণ পর নন্দাই মিস্তিরি একটা শালপাতার বড়ো খালায় করে চিড়ে, বাতাসা, পাকা আম আর, অন্য একটা খালায় করে বট-আঠার মতো ঘন দুধ এনে আমার সামনে নামিয়ে রাখলো ।
বললো, ” পেট ভরে খেইয়ে ল্যান , এই রাত্তিরে আপনেকে ইখন অনেকট পথ যেতে হব্যাক । ” আমি তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে এসে খেতে বসলাম। সেই ফলাহার মুখে দিতে-ই মনে হলো , খাবারের এমন অপূর্ব স্বাদ ইতিপূর্বে আমি যেন কোনও দিন পাইনি। ভাবলাম , অমৃত বলে যদি সত্যি-ই কিছু থেকে থাকে তাহলে, সেও বোধহয় , এর কাছে হার মানবে ! আমি খেতেখেতে-ই লক্ষ্য করলাম , নন্দাইমিস্তিরি তার দোকানের জিনিস -পত্র গোছগাছ করছে।
হাট প্রায় নিস্তব্ধ। দু-দশজন যারা ভাঙা হাটে সস্তায় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার জন্য বোধহয়,একটু আগেও এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করছিল তারাও এখন যে-যার বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছে। নন্দাইমিস্তিরি-র দোকানের দাওয়ায় বসেই দেখলাম , ভরা কোটা -লের বাধভাঙ্গা আলোয় ভুলভুলুনির হাট, রাস্তা -ঘাট, জঙ্গল সবকিছুই যেন হো-হো শব্দে ভেসে যাচ্ছে । বহুদূর থেকে শুনতে পেলাম , হাট-ফিরতি মানুষেরা চাঁদের সেই মায়াময় জ্যোৎস্নায় গান গায়তে গায়তে, বাঁশিতে সুর তুলতে তুলতে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে যে-যার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে !
পর্ব – ৯
ওদের দলবেঁধে বাড়ি ফেরার দৃশ্য নিজের কল্পনার আয়নায় দেখতে দেখতে হটাৎ যেন আমারও বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে গেল। ফুল্লরার কথা মনে পড়লো। বৃদ্ধ রামদীনের ভরসায় তাকে একা রেখে এই বিভূঁই জায়গায় সেই কখন রবিউলদের বাড়িটার থেকে বেরিয়েছি ! কথাগুলো ভাবতেই, মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠলো।
এতক্ষণে নিশ্চয় ওরা আমার চিন্তায় ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে। ফুল্লরার স্বভাব আমি জানি। সে নিশ্চয়ই বৃদ্ধ রামদীনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির সামনের মাঠটায় এসে দাঁড়িয়ে আছে । আমি তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে হাতমুখ ধুয়ে এসে নন্দাই মিস্তিরির সামনে দাঁড়ালাম । বললাম, ” মিস্তিরি, এবার তাহলে আসি ! ” নন্দাই মিস্তিরি আমাকে আবারও , ” আর ইকটুক দাঁড়ান! ” বলেই কুপি লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে সে তার দোকানঘরের ভিতরে ঢুকে গেল । খানিক বাদেই দুটো বাজার-ভরা থলি নিয়ে এসে আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলে যত্ন করে বেঁধে দিল।
থলিগুলোর ভেতরে যে চিড়া, খৈ,মুড়ি, মুড়কি, চাল,ডাল,আনাজপাতিই ভর্তি আছে সেটা আমি না দেখেও বেশ বুঝতে পারলাম ! এরপর, নন্দাইমিস্তিরির একটা অদ্ভুত আচরণে আমি যার -পরনাই ঘাবড়ে গেলাম ! হটাৎ-ই , সে আমার সাইকেলেটার হ্যান্ডেলের উপর প্রণাম করার ভঙ্গিতে মাথাটা ছুঁইয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে বলে উঠলো , ” সাইকিল- ঠাকুর , সওয়ারীকে লিয়ে যে পথে এইচেন সেই পথেই ফিরে যান। জোছনার পীরিতি-আলোয় পথ হারায়েননি বাবা ।
ভুলভুলুনির ই-পথ বড় ভয়ঙ্কর পথ! ই-পথে কেউ অ্যাকবার হারায়ে গেলে সারা জেবন ধরে তাকে নিষ্কান্তের পথ খুঁজে মরতে হব্যাক ! ” তারপর , অদ্ভুতভাবে তার ঝাকড়া চুলভর্তি মাথাটা দুপাশে ঘনঘন নাড়াতে নাড়াতে যেন এক অপার্থিব সুরে আবারও সে বিড়বিড় করে উঠলো । বললো, ” যাও বাবা , যাও, নন্দাইমিস্তিরির হাতযশের অবমান করনি। যে পথে এইচো সেই পথেই ফিরে যাও । লোতোন বাবুর পরিবার তার লেগে পথ চেয়ে বসে আছেন! ”
নন্দাইমিস্তিরির অদ্ভুতধরণের কথাবার্তা আর, তার সেই রহস্যময় বিভঙ্গ আমার শরীরের ভিতরে কেমন যেন একটা শিরশিরেনি অনুভূতির সৃষ্টি করলো । আমি আর কোনো কথা না-বলেই, সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে সীটে চেপে বসলাম!
…… আর, সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলটা চাঁদের অভিসারী আলোয় এক রহস্যময় লহর তুলে মাঠঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে ঝড়ের গতিতে আমাকে নিয়ে যেন ছুটতে শুরু করলো !
(শেষ)
Post a Comment